চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএ চুক্তির মোট মূল্য ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৪৪ শতাংশ বেশি। এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত। একই সঙ্গে ক্রিপ্টো অবকাঠামোও বড় বড় করপোরেট চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিলজিক সম্প্রতি এ তথ্য জানিয়েছে। খবর রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথমার্ধে করপোরেট চুক্তির গতি এতটাই বেড়েছে যে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ৪৪টি চুক্তি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএর মোট মূল্য ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
বর্তমানে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে এআই সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু নতুন ব্যবসা বা আয়ের উৎস কিনছে না। তারা কিনছে এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার, চিপ, সফটওয়্যার প্লাটফর্ম ও অন্যান্য অবকাঠামো।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের সবচেয়ে বড় করপোরেট লেনদেনগুলোর প্রায় এক-চতুর্থাংশই সরাসরি এআই-কেন্দ্রিক। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের এআই সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল অংকের বিনিয়োগ করছে।
এআই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্ট ২০২৬ সালে এআই-সংশ্লিষ্ট মূলধনি ব্যয়ে সম্মিলিতভাবে ৭০ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্পেসএক্সের ৬ হাজার কোটি ডলারের একটি চুক্তি এ বছরের আলোচিত লেনদেনগুলোর মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি সেলসফোর্সও ৩৬০ কোটি ডলারের একটি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করেছে।
তবে বড় অংকের চুক্তি বাড়লেও মোট চুক্তির সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। অর্থাৎ আগের মতো বিপুলসংখ্যক ছোট চুক্তি হচ্ছে না। বরং কমসংখ্যক হলেও প্রতিটি চুক্তির মূল্য অনেক বেশি। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অধিগ্রহণেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।
এদিকে এআই খাতের সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ পেয়েছে ক্রিপ্টো মাইনিং কোম্পানিগুলো। আগে যেসব প্রতিষ্ঠান মূলত বিটকয়েন বা অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রা মাইনিং করত, তারা এখন নিজেদের অবকাঠামো এআই ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং (এইচপিসি) সেবায় ব্যবহার করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ক্রিপ্টো মাইনিং কোম্পানি এরই মধ্যে ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি মূল্যের এআই ও এইচপিসি চুক্তি নিশ্চিত করেছে। অনেকেরই আগে থেকেই জমি, বিদ্যুৎ সংযোগ, ডেটা সেন্টার ও কুলিং অবকাঠামো রয়েছে। ফলে নতুন করে বড় বিনিয়োগ ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান এআই খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে পারছে।
প্রচলিত ক্রিপ্টো মাইনিং থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় তুলনামূলক কম হলেও এআই-সংশ্লিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে বাজারমূল্য দ্রুত বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরাও এখন এসব কোম্পানিকে শুধু ক্রিপ্টো খাতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না। বরং এআই অবকাঠামো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেও মূল্যায়ন করছেন।
এমঅ্যান্ডএ বাজারে আরেকটি নতুন প্রবণতা দেখা গেছে। কিছু করপোরেট অধিগ্রহণে প্রচলিত নগদ অর্থ বা শেয়ারের পরিবর্তে ডিজিটাল টোকেন ব্যবহার হচ্ছে। এর একটি উদাহরণ হলো অ্যামাডিউস প্রটোকলের ১৭ লাখ ডলারে বিটে.এআই অধিগ্রহণ। এ লেনদেনে অধিগ্রহণের মূল্য পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে টোকেন। যদিও এ ধরনের চুক্তির সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত।
বিশ্লেষকদের মতে, টোকেন-ভিত্তিক লেনদেনের আলোচনা বাড়লেও বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএর অধিকাংশ অর্থ এখনো প্রচলিত করপোরেট কাঠামো, শেয়ার ও ঋণভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের এমঅ্যান্ডএ বাজারের তুলনায় টোকেন-ভিত্তিক লেনদেনের আকার এখনো খুবই ছোট।
অন্যদিকে এআই খাতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়তে থাকায় ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর প্রতিযোগিতাও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যেসব ক্রিপ্টো মাইনিং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চুক্তি এবং প্রস্তুত অবকাঠামো রয়েছে, তারা এ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেতে পারে। দুই বছর আগেও যেসব সম্পদের মূল্যায়ন তুলনামূলক কম ছিল, এখন সেগুলোই বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সিটিগ্রুপের এমঅ্যান্ডএ সহপ্রধান গুইলারমো বায়গুয়ালের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত না হলে ২০২৬ সালে করপোরেট চুক্তির বাজার ইতিবাচক থাকবে। তবে প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হলে বছরের শেষে আগের বছরের রেকর্ড অতিক্রম করা কঠিন হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
এর আগে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে বছরের প্রথম তিন মাসে মোট মেগাডিল সম্পন্ন হয়েছে ২২টি। এটি এ পর্যন্ত যেকোনো প্রান্তিকের জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর আগে ২০১৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে সর্বোচ্চ ২১টি মেগাডিল হয়েছিল। পাশাপাশি এ নিয়ে টানা তিনটি প্রান্তিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন দেখল বিশ্ব অর্থনীতি।
এ জাতীয় আরো খবর..