✕


বিশ্বে ৬৪ কোটি মানুষের অনাহার সত্ত্বেও বছরে ১০৫ কোটি টন খাবার অপচয়, শীর্ষে কোন দেশ?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৭, | ০২:২৬:০৪ |

বিশ্বজুড়ে একদিকে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছেন, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাবার প্রতি বছর ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বে পরিবেশন করা প্রতি পাঁচ প্লেট খাবারের প্রায় এক প্লেট শেষ পর্যন্ত ডাস্টবিনে যায়। বছরে অপচয় হওয়া এই খাবারের পরিমাণ ১০০ কোটি টনেরও বেশি। অথচ জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত ছিলেন—অর্থাৎ প্রতি ১৩ জনে একজনেরও বেশি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পাননি। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়। দিনটিকে স্মরণ করে প্রতিবছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’। ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা এবং বিপুল খাদ্য অপচয়ের এই বৈপরীত্য দিবসটির প্রেক্ষাপটে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ক্ষুধা কমলেও সংকট কাটেনি
বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার হার টানা তৃতীয় বছরের মতো কমেছে। তবে পরিস্থিতি এখনো কোভিড-১৯ মহামারির আগের সময়ের তুলনায় খারাপ। জাতিসংঘের বার্ষিক প্রতিবেদন ‘বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মধ্যে ছিলেন। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২২ সালে ক্ষুধার হার সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে হার কমলেও ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ বেশি।

আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি আফ্রিকায়। ২০২৫ সালে মহাদেশটিতে আনুমানিক ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছেন। অর্থাৎ আফ্রিকার প্রতি পাঁচজনের একজন ক্ষুধার্ত ছিলেন। বিশ্বে মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই এই মহাদেশের বাসিন্দা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আটটি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে রয়েছে। ১২২টি দেশকে নিয়ে করা তালিকায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে সোমালিয়া। এরপর রয়েছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, চাদ ও মাদাগাস্কার। সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

উৎপাদন থেকে ভোক্তা—সব পর্যায়েই অপচয়
খাদ্য অপচয় শুরু হয় উৎপাদনের পর থেকেই। মাঠ থেকে দোকান হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল কাটার পর এবং দোকানে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ফলমূল ও শাকসবজির অপচয়ের হার সবচেয়ে বেশি। দোকানে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হওয়া এসব খাদ্যের বার্ষিক আর্থিক মূল্য ৪০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।

এরপর ভোক্তা পর্যায়েও বিপুল পরিমাণ খাবার ফেলে দেওয়া হয়। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বলছে, ২০২২ সালে দোকান, রেস্তোরাঁ ও গৃহস্থালি থেকে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার ফেলে দেওয়া হয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে সহজলভ্য মোট খাবারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান এই পরিমাণ। এত বিপুল খাবার পরিবহনের জন্য ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাক প্রয়োজন হতো, যার প্রতিটির বহনক্ষমতা ২০ টন।

ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ে শীর্ষে মালদ্বীপ
বিশ্বে একজন মানুষ গড়ে বছরে প্রায় ১৩২ কেজি খাবার অপচয় করেন। এর মধ্যে গৃহস্থালি পর্যায়েই অপচয় হয় প্রায় ৭৯ কেজি।
তবে দেশভেদে এই চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, তুলনামূলক উষ্ণ দেশগুলোতে বাড়িতে খাবার অপচয়ের হার বেশি। তাজা খাবারের বেশি ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত হিমায়নব্যবস্থার অভাব এর সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মালদ্বীপ। দেশটিতে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার ফেলে দেন, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এরপর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, সেশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে ব্যক্তিপ্রতি বছরে ২১০ কেজির বেশি খাবার অপচয় হয়। অন্যদিকে, ইউরোপের স্পেনে ব্যক্তিপ্রতি খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ সবচেয়ে কম। সেখানে একজন মানুষ বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তারও কম খাবার অপচয় করেন।

খাদ্য অপচয়ে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি
খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহে ব্যবহৃত অর্থ, জমি ও জ্বালানির বড় অংশই অপচয় হওয়া খাবারের সঙ্গে নষ্ট হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, খাদ্য বিনষ্ট ও অপচয়ের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিবছর ১ লাখ কোটি ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়।
যেসব খাবার শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না, সেগুলো উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর জমি। বিশ্বের মোট কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ এই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

খাদ্য অপচয়ের পরিবেশগত প্রভাবও গুরুতর। ফেলে দেওয়া খাবার পচে মিথেন গ্যাস তৈরি করে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পচে যাওয়া খাবার থেকে উৎপন্ন মিথেনের কারণে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের সঙ্গে খাদ্য অপচয় সম্পর্কিত।

বিশ্ব খাদ্য দিবসে এসব পরিসংখ্যান আবারও সামনে এনেছে একটি বড় বৈশ্বিক বৈপরীত্য—একদিকে কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধা, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যের অপচয়। সূত্র: আল জাজিরা।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..