✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৭, | ০২:৪২:০৩ |নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের এক জমকালো প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত শ্রোতারা যখন রোমাঞ্চে দম বন্ধ করে বসে ছিলেন, ঠিক তখন তাদের মাঝেই উপস্থিত ছিলেন ৬২ বছর বয়সী এক প্রবীণ ডুবুরি। নতুন মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র 'হোয়েলফল'-এর বিশেষ প্র প্রদর্শনীতে তিনি যখন বললেন যে একটি বিশালাকার তিমি তাকে গিলে ফেলেনি বরং তিনি তার মুখের ভেতর দীর্ঘ সময় আটকে ছিলেন, তখন উপস্থিত হলিউড তারকা জশ ব্রোলিন পর্যন্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
প্রবীণ এই লবস্টার ডুবুরির নাম মাইকেল প্যাকার্ড। বলা চলে, বিশ্বের নথিবদ্ধ ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তিনিই একমাত্র জীবন্ত সাক্ষী যিনি একটি বিশালাকার তিমির পেটের ভেতরে আটকে পড়েও অলৌকিক জীবন নিয়ে ফিরে এসেছেন। তার এই অবিশ্বাস্য বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র তৈরি না হলেও সদ্য মুক্তি পাওয়া কাল্পনিক চলচ্চিত্র হোয়েলফল-এর গল্পটি তার জীবনসংগ্রামের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২১ সালের ১১ জুনের এক সকালে। কেপ কডের প্রভিন্সটাউন উপকূলে নিজের প্রিয় দ্বিতীয় ডুবটির জন্য পানির নিচে নেমেছিলেন প্যাকার্ড। তখন তিনি নিজের ১৬ বছর বয়স থেকে অর্জিত দক্ষতা নিয়ে লবস্টার শিকার করছিলেন। সাগরের শান্ত নীল পরিবেশ তার কাছে একধরনের শান্তি নিয়ে আসত, যা শীতকালীন বিষণ্নতা দূর করতে সাহায্য করত।
হঠাৎ করেই সমুদ্রের তলদেশে এক প্রচণ্ড ধাক্কা অনুভব করেন তিনি। চতুর্দিক ভেসে যায় তীব্র জলের তোড়ে এবং সবকিছু নিমেষেই অন্ধকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো কোনো বিশাল গ্রেট হোয়াইট শার্ক তাকে আক্রমণ করেছে। কিন্তু কোনো কামড়ের দাগ বা দাঁতের স্পর্শ না পেয়ে তিনি বুঝতে পারেন তিনি একটি বিশাল প্রাণীর মুখের শক্ত চোয়ালের মধ্যে পিষ্ট হচ্ছেন। চারপাশের পরিবেশ ও অবস্থান বিবেচনা করে তিনি অনুধাবন করেন, তিনি ভুলবশত একটি বিশাল প্রজাতি হ্যাম্পব্যাক তিমির মুখে ঢুকে পড়েছেন।
তিমির পেটের ভেতর আটকে থাকা সেই অত্যন্ত ভীতিপ্রদ মুহূর্তের বিবরণ দিতে গিয়ে প্যাকার্ড জানান যে তিমির দানবীয় জিহ্বাটি তার পুরো শরীরে অবিরত সংকোচন ও প্রসারণ ঘটাচ্ছিল। অনুভূতিটি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তা ছিল এমন যেন এক জীবিত প্রাণী তাকে জ্যান্ত খেয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। তিমির মুখ থেকে আত্মরক্ষার জন্য নিজের অক্সিজেনের রেগুলেটরটি মুখে চেপে ধরে তিনি ভেতরে হাত-পা ছুড়তে থাকেন এবং তিমির মুখের ভেতরের দেয়ালে হাত দিয়ে আঘাত করতে শুরু করেন। কিন্তু সেই আঘাত তিমির বিশালাকার দেহের সামনে একেবারেই ব্যর্থ প্রমাণ হয়।
ওই অন্ধকার মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল, হয়তো তিমির পেটে বাতাস ফুরিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে অন্তত ৪৫ মিনিট এভাবে আটকে থাকতে হবে এবং ধীরে ধীরে দম বন্ধ হয়ে মারা যেতে হবে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি তার দুই সন্তান জ্যাকব ও জোসাইয়া এবং বৃদ্ধা মায়ের কথা ভেবে আকুল হয়ে পড়েছিলেন। তবে ঠিক ৩০ থেকে ৪৫ সেকেন্ড পরেই তিমিটি হঠাৎ পানির ওপরে উঠে আসে এবং তাকে তীব্র ফেনার সাথে শূন্যে উগরে দেয়। সমুদ্রের ওপর ভেসে ওঠার পর সহকর্মী জোসাইয়া তাকে বোটে তুলে নিলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং আর্তনাদ করে বলেন, তিনি এক তিমির মুখের ভেতর থেকে বেঁচে ফিরে এসেছেন।
নিউইয়র্কের রিগ্যাল টাইমস স্কয়ারের ফোরাম ফোরডিএক্স প্রেক্ষাগৃহে বসে মুভিটি দেখার পর প্যাকার্ড জানান, ছবিটির ট্রেলার দেখার সময় থেকেই তার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। পর্দায় দেখা মূল চরিত্র জয়ের তিমি ও দানবীয় স্কুইডের মুখোমুখি হওয়া কিংবা তিমির পেটের ভেতরের সংকুচিত নড়াচড়ার দৃশ্যগুলো দেখে তিনি সরাসরি নিজের অভিজ্ঞতার সাথে তা মেলাতে পারছিলেন। প্যাকার্ড স্বীকার করেছেন যে সমুদ্রের ভয়ংকর পরিবেশ ও মানুষের বেঁচে থাকার অবিনাশী ইচ্ছার যে রূপায়ন ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে, তা তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। তিনি জানান, জীবনে তিনবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি, ১৪ বছর বয়সে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচা, ২০০১ সালে কোস্টারিকার বিমান দুর্ঘটনায় দুই দিন জঙ্গলে আহত অবস্থায় পড়ে থাকার পর উদ্ধার পাওয়া এবং সবশেষে এই তিমির পেটের অভিজ্ঞতা।
প্যাকার্ডের মতে, সাগরের বুকে তিমি মারা যাওয়ার পর তার কঙ্কাল যেভাবে সমুদ্রের পুষ্টি মেটায় এবং অন্য প্রাণীদের আশ্রয়ে পরিণত হয়; যা 'হোয়েলফল' নামে পরিচিত—মানুষের জীবনও ঠিক তেমনি অর্থবহ হতে পারে। বর্তমানে জিমি কিমেল শো বা ৬২ মিনিটের অস্ট্রেলীয় তথ্যচিত্রে নিজের জীবনসংগ্রামের কথা শোনানো প্যাকার্ড বিশ্বাস করেন, তার এই অবিশ্বাস্য জীবনের গল্প মানুষের মাঝে এক গভীর বিস্ময় ও অনুভূতির জন্ম দেয়। আর মানুষকে এই আশ্চর্য ও রোমাঞ্চকর অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করানোই এখন তার জীবনের মূল স্বার্থকতা হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সিএনএন