‘দুইবার জন্ম দেয়ায়, মা তোমাকে ধন্যবাদ’

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-০৪, | ১০:৪৯:১৬ |

‘আমি তোমার জন্য জীবন দিতে পারি’- এটা আসলে আবেগের কথা, কথার কথা। কিন্তু বিষয়টা যদি হয় সন্তানের সুস্থতার, তবে মা সত্যি সত্যি সবকিছু দিতে পারেন। ভারতে ৬৮ বছর বয়সী এক নারী তার মেয়েকে সুস্থ করতে নিজের একটি কিডনি দান করেছেন।

মায়ের কিডনি নিয়ে সুস্থতার পথে থাকা মাইক্রোসফটের আসিয়ান অঞ্চলের জেনারেটিভ এআই-এর পরিচালক এবং কান্ট্রি হেড রঞ্জনী মণি নিজের লিঙ্কডইন একাউন্টে তুলে ধরেছেন তার অসুস্থতা ও চিকিৎসার কাহিনী।

২০ বছর বয়সেই রঞ্জনী মণি অটোসোমাল ডমিন্যান্ট পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ-এডিপিকেডি রোগে আক্রান্ত হন। এই রোগটি অবশ্য তাদের বংশগত। মণির বাবাও ৫০ বছর বয়সে এডিপিকেডি রোগে আক্রান্ত হন।

তিনি প্রায় এক দশক ধরে ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বাবার এই লড়াই দেখা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল বলে জানিয়েছেন মণি। আগে থেকে এডিপিকেডি রোগ সম্পর্কে জানা থাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ব্যায়াম এবং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে রোগটির বিস্তার ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন তিনি। এডিপিকেডি নিয়েই মণি বহু বছর ধরে সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন।

গর্ভাবস্থায় মণির স্বাস্থ্যের এই লড়াই আরও জটিল হয়ে ওঠে। যখন তার প্রি-এক্লাম্পসিয়া দেখা দেয় এবং মাত্র ৩০ সপ্তাহে তিনি সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দেন। মা ও শিশু উভয়েই সে যাত্রায় সুস্থ হয়ে উঠলেও, পরবর্তী বছরগুলোতে শারীরিকভাবে সক্ষম বোধ করার পরেও তাঁর কিডনির কার্যকারিতা ক্রমাগত কমতে থাকে।

মাস তিনেক আগে তার ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা একটি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়, যা চিকিৎসকদের ডায়ালাইসিস শুরু করার আগেই কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিতে বাধ্য করে। আজীবন ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হওয়া এড়াতে মণি আগেভাগেই কিডনি প্রতিস্থাপনের পথ বেছে নেন।

লিঙ্কডইন একাউন্টে মণি লিখেছেন, ‘এটি বেশ অদ্ভুত। আপনি এতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে পারেন, কিন্তু আপনার শরীর হয়তো সেই বার্তাটি পায় না। ৩ মাস আগে এটি (ক্রিয়েটিনিন) বিপজ্জনকভাবে ৮+ স্পর্শ করেছিল। 

চিকিৎসকরা অবাক হয়েছিলেন যে আমি এত কিছুর পরও কীভাবে এত ভালোভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তবে তারা আমাকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। একটি বিষয় আমি কখনোই মেনে নেব না, তা হলো সারাজীবন একটি যন্ত্রের (ডায়ালাইসিস মেশিন) সাথে বাঁধা থাকা। আমি যা করি তা আমি পছন্দ করি এবং আমি এতে বেশ দক্ষ। আমার আরও বড় লক্ষ্য রয়েছে।’

কিডনি প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেও সমস্যা ছিল ডোনার পাওয়া নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ৬৮ বছর বয়সী মা এগিয়ে আসেন। কিডনি প্রতিস্থাপনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনবেন কিনা তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন রঞ্জনী মণি। তবে অন্য এডিপিকেডি রোগীদের সাহস দিতেই তিনি চিকিৎসা প্রক্রিয়ার বিস্তারিত শেয়ার করেছেন লিঙ্কডইনে। তিনি আসলে অন্য এডিপিকেডি রোগীদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন, তারা যেন বোঝেন, যে তারা একা নন।

মণি লিখেছেন, ‘১২ দিন আগে আমার একটি লিভিং ডোনার কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। এটি প্রকাশ্যে শেয়ার করব কি না, তা নিয়ে অনেক ভেবেছি এবং শেষ পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কোনো সহানুভূতি বা মনোযোগ পাওয়ার জন্য নয়। বরং আমি একটি জেনেটিক জুয়াকে আমার পরিচয় বানাতে রাজি নই। আর এটি যদি অন্য কোনো ব্যক্তিকে তাঁর স্বাস্থ্য পরিচালনায় সাহায্য করে, তবেই তা সার্থক।’  

কিডনি দেয়ায় মাকে ধন্যবাদ জানিয়ে রঞ্জনি মণি লিখেছেন, ‘আমি ভাগ্যবান। আম্মা ৬৮ বছর বয়সে আমাকে তার কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এক অর্থে, তিনি আমাকে দুইবার জন্ম দিলেন।’

মণি স্বীকার করেন, বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকায় তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন, যেখানে অনেকেই কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়েও এই ধরনের সুযোগ পান না। নিজের এই অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নারীদের স্বাস্থ্যসেবার ওপর আলোকপাত করে একটি ‘এআই-চালিত তহবিল’ গঠনের পরিকল্পনা করছেন। তিনি এডিপিকেডি রোগীদের জন্য একটি ফাউন্ডেশনকে সহায়তা করতে চান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে জননীতি তৈরিতে অবদান রাখতে চান।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাশে থাকার জন্য মণি তার পরিবার, চিকিৎসক দল, সহকর্মী এবং মাইক্রোসফটের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি নারীদের সেবাদানের ক্ষেত্রে নার্সদের সহানুভূতি ও যত্নের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তাদের এই কাজ প্রযুক্তি কখনোই প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।

অস্ত্রোপচার থেকে সেরে ওঠার এই সময়ে তিনি জানান যে তিনি জীবনের প্রতিটি দিনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন এবং কাজে ফেরার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, ’এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া আমাকে জীবন সম্পর্কে আরও সচেতন হতে শিখিয়েছে। আর আমি কোনো শারীরিক অবস্থাকে আমার পরিচয় বানাতে রাজি নই। আমি আমার পরিকল্পনা করা দুর্দান্ত কাজগুলো শুরু করতে এবং এই সপ্তাহেই কাজে ফিরে যেতে উন্মুখ হয়ে আছি।’

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..