✕

সর্বশেষ :
জার্মানিতে বিপজ্জনক ছায়াযুদ্ধের শঙ্কা রাহুল গান্ধীর আবেদনে ১৪ ত্রুটি ধরল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ-ইউএই যৌথ উদ্যোগে কক্সবাজারে সুপেয় পানি প্রকল্পের প্রস্তাব দিলেন এলজিআরডি মন্ত্রী মেহেরপুরে বাসের ধাক্কায় ভ্যানচালক নিহত পাকিস্তান সিরিজে শ্রীলঙ্কার টেস্ট দল ঘোষণা, অধিনায়ক কুশল মেন্ডিস আরব আমিরাতে শ্রমবাজার ও নতুন সুযোগের সম্ভাবনা নিয়ে মাহ্দী আমিন-রাষ্ট্রদূতের বৈঠক কুমিল্লায় সকালে হাঁটতে বেরিয়ে গাড়িচাপায় স্বামী ও স্ত্রী নিহত কাদের মির্জা ও তার স্ত্রী-ছেলের বিরুদ্ধে দুদকের ৩ মামলা অবিবাহিতদের সবচেয়ে বেশি রাগিয়ে দেয় যেসব কথা দুর্গাপূজায় নৌপথে নিরাপত্তায় ১৬ নির্দেশনা

‘যতক্ষণ না নিখোঁজ থাকা শেষ স্বজনটির দেহ খুঁজে পাচ্ছি, ততক্ষণ কাঁদব না’

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২৪, | ১৪:৪০:১৬ |

ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে ভেনিজুয়েলার উত্তর উপকূলীয় এলাকা তছনছ হয়ে যাওয়ার এক মাস পার হয়ে গেলেও প্রিয়জনদের মরদেহ আর একগুচ্ছ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন দেশটির নিঃস্ব ও সহায়সম্বলহীন মানুষগুলো। এদিকে বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যেই ফিরে গেছে। তারপরও প্রিয়জনের শেষ দেখা পেতে মরিয়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। মিলবে কি লাশ, সেটা কবে—বারবার ঘুরেফিরে আসছে প্রশ্নগুলো। 

সমুদ্রের বুকে ভাসমান অবস্থায় জীবনে সবচেয়ে ভয়াবহ দিনের খবর পেয়েছিলেন ৪৯ বছর বয়সী জেলে ভিক্টর ক্যালডেরন। টানা ১৮ দিন সাগরে মাছ ধরে তীরে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার পরিবারের সব সদস্য যে বহুতল ভবনে বাস করতেন, সেটি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তীরে ফিরে তিনি আবিষ্কার করেন, তার পরিবারের বোন, তাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি, সৎবাবা এবং নয়জন খালাতো-ফুফাতো ভাইবোনসহ মোট ২৬ জন সদস্য এক লহমায় হারিয়ে গেছেন। স্বজনদের বয়স ছিল দুই বছর থেকে শুরু করে প্রায় সত্তরের কোঠায়। নীল টি-শার্ট পরা ভিক্টর এখন গলফ কোর্সে খাটানো অস্থায়ী তাঁবুতে তার বেঁচে যাওয়া একমাত্র মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে বাস করছেন। ধীরস্থির কণ্ঠে বাকরুদ্ধ ভিক্টর বলেন, এটি ভীষণ, ভীষণ করুণ এক ঘটনা। আমি এখনো তাদের জন্য কাঁদতে পারিনি, যতক্ষণ না নিখোঁজ থাকা শেষ স্বজনটির দেহ খুঁজে পাচ্ছি, ততক্ষণ কাঁদব না।

ভিক্টরের পুরো পরিবার লা গুয়াইরা রাজ্যের কারাবালেদা শহরের ‘ওপিপিই ২৬’ নামক একটি সরকারি আবাসন কমপ্লেক্সে বাস করত, যা এখন এই ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দু বা ‘গ্রাউন্ড জিরো’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেখানে ভিক্টরের মতো হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে চলেছেন। 

দেশটির সরকারের প্রতিদিনের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত ৫,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১৬,৫০০ জনেরও বেশি। সরকার নিখোঁজের কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা না প্রকাশ করলেও তা দশ হাজারেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

সম্প্রতি এক বিকেলে ‘ওপিপিই ২৬’ কমপ্লেক্সের রড ও কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক ১১ বছরের কন্যাসন্তানসহ তিনজনের লাশ বের করা হয়। এক মাস ধরে মেয়ের সন্ধানে ব্যাকুল বাবার বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। কালো প্লাস্টিকে মুড়ে শিশুর দেহটি বের করার সময় উদ্ধারকর্মীরা কাজ থামিয়ে নীরবতা পালন করেন ও প্রার্থনা জানান। নিঃশব্দে চোখ মুছতে মুছতে উদ্ধারকারী দলের সদস্য জিন হার্নান্দেজ বলেন, ঘটনাটি মন ভেঙে চুরমার করে দেয়। উদ্ধারকারী, পরিবার, বন্ধু—সবার জন্যই এটি আত্মা বিধ্বংসী।

বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যেই ফিরে যাওয়ায় এখন ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষদের নিজদের হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরাতে হচ্ছে। কারাবালেদার এই আবাসন কমপ্লেক্সের ১২টি ব্লকের মধ্যে ১০টি ব্লক কীভাবে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল, তা নিয়ে স্বজনহারা মানুষগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সেখানে উপস্থিত সবার মুখেই একই প্রশ্ন—ভবনগুলোর নকশায় কি কোনো ত্রুটি ছিল, নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল, নাকি এর পেছনে ছিল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা?

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা ভেনিজুয়েলার গণপূর্তমন্ত্রী হুয়ান হোসে রামিরেজের কাছে এই প্রশ্নগুলো রাখা হলে তিনি অবহেলার অভিযোগ উড়িয়ে দেন। মন্ত্রী দাবি করেন, ভবনগুলো মজবুতই ছিল, তবে পরপর দুটি প্রায় সমসাময়িক ও ভিন্নমুখী ভূকম্পনের আঘাত সামলানোর সক্ষমতা বিশ্বের কোনো দেশেরই ছিল না। রাস্তার ওপারের ধ্বংসস্তূপ দেখিয়ে তিনি বলেন, আমাদের চারপাশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের ভবনই ধসে পড়েছে, এই ভূমিকম্প সরকারি বা বেসরকারি কাঠামোর মধ্যে কোনো বৈষম্য করেনি।

এদিকে কাতিয়া লা মার উপকূলীয় শহরের একটি বেসরকারি ভবনে ভূমিকম্পের আট দিন পর ভূগর্ভস্থ পার্কিং লট থেকে হার্নান গিল নামের এক নিরাপত্তাপ্রহরীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল, যা পুরো দেশের আশার প্রদীপ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই একই ভবনের ভূগর্ভস্থ পার্কিং লটে আটকা পড়ে থাকা ভগ্নিপতির মরদেহের সন্ধানে এখনো লড়াই করে যাচ্ছেন লরা ব্যারিওস নামের এক নারী। কারণ আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী দল ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর ভারী যন্ত্রপাতি অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাত্র এক দিন আগেই ঘরের বেডরুমে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে পড়ে থাকা তার বোন ও ১০ ও ৩ বছর বয়সী দুটি শিশুর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কান্নাভেজা কণ্ঠে লরা বলেন, গতকাল ভেনিজুয়েলায় শিশু দিবস ছিল, কিন্তু আমাদের কোনো শিশু নেই উদযাপন করার মতো; আমাদের শিশুরা চলে গেছে। ধীরগতিতে উদ্ধারকাজ চালানো ও কাজ শেষ হওয়ার আগেই যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়ার খবরে কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, এই ধ্বংসস্তূপ নতুন করে আর কী বলবে যা আমরা খালি চোখে দেখছি না? হারিয়ে যাওয়া টি-শার্ট, ব্যবহার না হওয়া চামচ-কাঁটাচামচ, তৈজসপত্রের সেট কিংবা খেলনা—মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আস্ত জীবনগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

মার্কিনভিত্তিক মানবিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন’-এর খাবারের সারিতে দাঁড়িয়ে চরম বিপদের মুখেও ভেনিজুয়েলানদের চিরাচরিত রসিকতা ও সহমর্মিতা দেখা যায়। গরম খাবার আর বোতলজাত পানির পাশাপাশি তারা মানুষের উষ্ণ আলিঙ্গন আর সহানুভূতির খোঁজ করছেন, যদিও দিনশেষে তাঁদের ফিরতে হচ্ছে ফুটপাতে টাঙানো সাধারণ প্লাস্টিকের তাঁবুতেই। 

চলতি সপ্তাহে ডেলসি রদ্রিগেজের ভারপ্রাপ্ত সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের ২০০টি বাড়ি উপহার দিলেও প্রকৃত চাহিদার তুলনায় তা শতভাগের এক ভাগ মাত্র। ডেলসি রদ্রিগেজ গত জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনীর হাতে নিকোলাস মাদুরোর গ্রেফতারের পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থন থাকলেও ভেনিজুয়েলার প্রধান অর্থকরী খাত তেল শিল্প এখন ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে, ফলে দেশটির পুনর্গঠন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা অনিশ্চিত। 

বিশ্বব্যাংকের মতে, এই বিপর্যয়ে প্রায় ১৯.৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা কাটিয়ে উঠতে বছরের পর বছর সময় ও কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ লাগবে। ছুটির দিনে প্লায়া পিরাতা সৈকতে বেড়াতে আসা মানুষগুলো চোখের সামনে নিজেদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হতে দেখে স্বজনদের বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন, কিন্তু আজ তাদের ভাগ্যে অবশিষ্ট রয়েছে এক না পাওয়ার হাহাকার ও চিরদিনের গভীর ক্ষত।

সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..