বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৮০ কোটি মানুষ আবাসন সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ১১০ কোটির বেশি মানুষ বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করছে।
সম্প্রতি এসব তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির হিসাবে, বিশ্বের ৩০ কোটির বেশি মানুষ এখন গৃহহীন। দ্রুত বাড়তে থাকা এ সংকটকে বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ও নগর উন্নয়নের জন্য বড় বাধা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর ইউএন।
আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে চলতি সপ্তাহে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড আরবান ফোরামের (ডব্লিউইউএফ১৩) মূল আলোচ্য বিষয় হয়েছে আবাসন সংকট। এতে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, মেয়র, নগর পরিকল্পনাবিদ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
জাতিসংঘ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে আবাসন সমস্যা আরো জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শহরগুলোয় কম আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
আবাসন সংকট এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, যেখানে মানুষের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ, উপযুক্ত ও সাশ্রয়ী ঘরবাড়ির সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন সংকট এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কারণ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান না থাকলে শ্রমবাজার, উৎপাদনশীলতা ও নগর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এদিকে বড় শহরগুলোয় বাড়িভাড়া বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয়ও বাড়ছে। এতে ভোগ ব্যয় কমে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচি ইউএন-হ্যাবিট্যাট জানায়, গত এক দশকে বিশ্বের ১২ কোটির বেশি মানুষ নতুন করে বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে যেতে বাধ্য হয়েছে। অনেক দেশে জাতীয় নগরনীতি গ্রহণ করা হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশ এরই মধ্যে জাতীয় নগরনীতি নিয়েছে বা প্রণয়নের কাজ করছে। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশ আবাসনকে সাশ্রয়ী করার কর্মসূচিও চালু করেছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফোরামে সামাজিক আবাসন প্রকল্প সম্প্রসারণ, বস্তি উন্নয়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠনও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিরিয়ার হোমস শহরের মেয়র বাশার আল সেবাই বলেন, ‘যুদ্ধের পর প্রায় চার লাখ মানুষ শহরে ফিরেছে। কিন্তু তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় ফিরে এসেছে। সেখানে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব পুনর্গঠনে অর্থায়নের প্রয়োজন।’
জাতিসংঘ বলছে, যুদ্ধ ও জলবায়ু সংকটের কারণে বিশ্বে ‘জোরপূর্বক’ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এতে আবাসন চাহিদার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক শহরে দ্রুত জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বন্যা, তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে অনিরাপদ আবাসনে থাকা মানুষের।
বাকুতে ফোরামের প্রথম দিন ভারি বৃষ্টিতে অনেক সড়ক প্লাবিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও এ সময় এমন আবহাওয়া সেখানে খুব কম দেখা যেত। একে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্থপতি ও কনসোর্টিয়াম ফর সাসটেইনেবল আরবানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা ল্যান্স জে ব্রাউন বলেন, ‘বিশ্বের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও কম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও গৃহহীনতার সংকট বাড়ছে। নিউইয়র্কের পরিস্থিতিকেও তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।’
জাতিসংঘ বলছে, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা টেকসই নগর উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। তাই বিশ্বব্যাপী সমন্বিত পরিকল্পনা, স্থানীয় উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। ফোরামের সুপারিশগুলো আগামী বছরের জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘নিউ আরবান এজেন্ডা’ বাস্তবায়নবিষয়ক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..