মার্কিন রোষানলে রাউল কাস্ত্রো, কিউবার ভবিষ্যত কি?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২১, | ১৭:৫৯:২১ |

কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করার ঘটনাটি ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতাকে নজিরবিহীন উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে অনেকেই ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পূর্ববর্তী মার্কিন কৌশলের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে লাতিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ওপর এমন সাঁড়াশি চাপ নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।

গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে রাউল কাস্ত্রো ও তার পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের নথি প্রকাশ্যে আনা হয়। মার্কিন কৌঁসুলিদের দাবি, ১৯৯৬ সালে কিউবার উপকূলে দুটি মার্কিন বেসামরিক বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাউল কাস্ত্রো। ওই ঘটনায় চারজন কিউবান-আমেরিকান নাগরিক নিহত হন, যার প্রেক্ষিতে এখন মার্কিন নাগরিকদের হত্যা, বিমান ধ্বংস এবং ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে ৯৬ বছর বয়সী এই বিপ্লবী নেতার বিরুদ্ধে।

১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির সেই ঐতিহাসিক ঘটনায় কিউবার আকাশসীমা লঙ্ঘনের দায়ে দুটি সেসনা বিমানকে গুলি করে নামিয়েছিল কিউবান যুদ্ধবিমান। বিমানগুলো পরিচালনা করত ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ নামক একটি কিউবান-বিরোধী মার্কিন সংগঠন, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিআইএ-র সাবেক সদস্য হোসে বাসুলতো। যদিও কিউবার পক্ষ থেকে সবসময়ই বলা হয়েছে যে, এই সংগঠনটি হাভানার আকাশসীমা দফায় দফায় লঙ্ঘন করে দেশের অভ্যন্তরে অস্ত্র চোরাচালান ও সরকারবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিল এবং আত্মরক্ষার্থেই কিউবা তখন সীমান্ত সুরক্ষার পদক্ষেপ নিয়েছিল।

বাস্তবতার নিরিখে রাউল কাস্ত্রোকে কখনোই মার্কিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তীব্র সংশয় রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার কোনো কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই এবং কিউবার বর্তমান সরকার তাদের একজন জাতীয় বীর ও সাবেক প্রেসিডেন্টকে কোনোভাবেই ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দেবে না। তবে মার্কিন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কাস্ত্রোকে নিজেদের হেফাজতে নিতে তারা আইনি ও কৌশলগত সব পথই খোলা রাখছেন।

মার্কিন এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, কিউবার ওপর সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন চালানোর একটি ভুয়া অজুহাত তৈরি করতেই ওয়াশিংটন এই আইনি নাটক সাজিয়েছে, যা কিউবার বিপ্লবী জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করবে।

এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই আড়াল করেননি। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় বিশেষ সামরিক অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, এবার কিউবার পতনের পালা। এই বিবৃতির পরপরই কিউবার ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা হয় এবং মার্কিন গোয়েন্দারা দাবি করতে শুরু করে যে কিউবা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা হাভানা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

কূটনৈতিক এই রেষারেষির মধ্যেই ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস নিমিৎজ মোতায়েন করায় সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের লাতিন আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক ড্যানিয়েল শ মনে করেন, ওয়াশিংটন মূলত কিউবার শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি আইনি ও প্রচারণামূলক অজুহাত খুঁজছিল, যাতে সামরিক আগ্রাসনের পথ সুগম হয়। তবে কিউবার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, তাদের মাটিতে যেকোনো ধরনের মার্কিন আগ্রাসনের ফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী।

মূলত কিউবার ওপর ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। মার্কিন প্রশাসন চায় কিউবা যেন রাশিয়া, চীন ও ইরানের সাথে তার কৌশলগত সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সমাজতন্ত্রের পথ পরিহার করে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে কিউবার সাধারণ মানুষ যখন খাদ্য ও বিদ্যুৎ সংকটে জর্জরিত, তখন ওয়াশিংটনের এই নতুন চাপ দেশটির সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চরম পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

আরটির বিশ্লেষণ

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..