সত্যিই কি মার্কিন গ্যাস স্টেশনে সাইবার হামলা চালিয়েছে ইরান?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-১৬, | ১১:০২:৫৭ |

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গ্যাস স্টেশনগুলোর জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় সাইবার অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির কর্মকর্তাদের সন্দেহ, এই হামলার পেছনে ইরান-সমর্থিত হ্যাকাররা জড়িত থাকতে পারে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হ্যাকাররা গ্যাস স্টেশনগুলোর ‘অটোমেটিক ট্যাংক গেজ’ (এটিজি) সিস্টেমে প্রবেশ করেছে। এসব সিস্টেম অনেক ক্ষেত্রেই ইন্টারনেটে উন্মুক্ত ছিল এবং পাসওয়ার্ড সুরক্ষাহীন অবস্থায় থাকায় সহজেই হ্যাক করা সম্ভব হয়েছে। হ্যাকাররা কিছু ক্ষেত্রে ট্যাংকের জ্বালানির প্রদর্শিত তথ্য পরিবর্তন করতে পারলেও প্রকৃত জ্বালানির পরিমাণে হস্তক্ষেপ করতে পারেনি।

রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এই অনুপ্রবেশে কোনও শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনও হ্যাকার যদি এটিজি সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তাহলে গ্যাস লিকের মতো বিপজ্জনক ঘটনা গোপন রাখা সম্ভব হতে পারে, যা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, অতীতে ইরান একই ধরনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল বলেই দেশটিকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত ফরেনসিক প্রমাণ না থাকায় নিশ্চিতভাবে দায়ী পক্ষকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।

যদি ইরানের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তবে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে তেহরানের আরেকটি সাইবার হুমকি। বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সরাসরি সামরিক হামলা চালানোর সীমিত সক্ষমতার কারণে সাইবার হামলাকে বিকল্প কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর হতে পারে। কারণ যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং সাম্প্রতিক এক জরিপে ৭৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরান যুদ্ধ তাদের আর্থিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে ইন্টারনেট-সংযুক্ত এটিজি সিস্টেমগুলো বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০১৫ সালে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ড মাইক্রো পরীক্ষামূলকভাবে কিছু ভুয়া এটিজি সিস্টেম অনলাইনে উন্মুক্ত করে দিলে দ্রুতই একটি প্রো-ইরান গোষ্ঠী সেগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা চালায়।

এদিকে ২০২১ সালে স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অভ্যন্তরীণ নথির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, গ্যাস স্টেশনের এটিজি সিস্টেমকে ভবিষ্যৎ সাইবার হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সাইবার সক্ষমতাকে চীন বা রাশিয়ার তুলনায় দুর্বল বলে মনে করলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেশটির হ্যাকারদের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান-ঘনিষ্ঠ হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক তেল-গ্যাস ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া একটি মার্কিন মেডিকেল ডিভাইস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের শিপমেন্ট কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটে এবং এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলের ব্যক্তিগত ইমেইল ফাঁসের ঘটনাও ঘটে।

ইসরায়েলের জাতীয় সাইবার অধিদফতরের প্রধান ইয়োসি কারাদি সিএনএনকে বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের সাইবার কার্যক্রমের গতি ও পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার ভাষায়, “ইরানি হ্যাকাররা এখন সাইবার হামলার পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণাও সমন্বিতভাবে চালাচ্ছে।”

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন উইকফ বলেন, ইরানের নতুন কৌশলের মধ্যে রয়েছে দ্রুত ‘যথেষ্ট কার্যকর’ ম্যালওয়্যার তৈরি, ধ্বংসাত্মক সফটওয়্যার ব্যবহার এবং তথ্য চুরি করে প্রচারণামূলকভাবে প্রকাশ করা।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামীর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও ইরান সাইবার ও তথ্যযুদ্ধ চালাতে পারে। ২০২০ সালের নির্বাচনে ভোটারদের ভয় দেখাতে ভুয়া পরিচয়ে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছিল ইরানের বিরুদ্ধে। এছাড়া ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্প প্রচারণা শিবিরে হ্যাকিংয়ের ঘটনাতেও ইরানি হ্যাকারদের দায়ী করা হয়।

সাবেক মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ক্রিস ক্রেবসের মতে, ভবিষ্যতে সরাসরি ভোটিং সিস্টেম নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক তথ্যযুদ্ধ ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণাই বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় এসব তথ্যযুদ্ধ এখন খুব কম খরচে এবং দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, অথচ এর জন্য কার্যত কেউ জবাবদিহির মুখে পড়ছে না।” সূত্র: সিএনএন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..