সামিনা নাফিজের চিত্রকর্ম যেন একেকটি অন্তরযাত্রার কণ্ঠস্বর

পারিবারিক পরিসরে অনানুষ্ঠানিকভাবে চিত্রশিল্পী সামিনা নাফিজের নবম একক প্রদর্শনীর যাত্রা শুরু হয় বারিধারার ঐতিহ্যবাহী ‘দেশ আর্ট গ্যালারি’তে।।

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-১৬, | ১৭:১৩:০৮ |
প্রকৃতি, সময় এবং ঘনিষ্ঠজনদের ঘিরে মানুষের মনোজগতে তৈরি হয় অনুভূতির এক তীব্র ঘূর্ণি। সেই ঘূর্ণির ভেতর দিয়ে ধাপে ধাপে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায় প্রতিটি সৃষ্টিশীল মানুষ। চিত্রশিল্পী সামিনা নাফিজের জীবনবোধ এবং তার প্রতিটি চিত্রকর্ম যেন সেই অন্তরযাত্রারই কণ্ঠস্বর।

প্রচারণাবিমুখ এই শিল্পীর চারদিনব্যাপী একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘দেশজ শিল্পের পুনর্বয়ন: অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব’ অনুষ্ঠিত হল রাজধানীর বারিধারার ঐতিহ্যবাহী ‘দেশ আর্ট গ্যালারি’তে। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এই প্রদর্শনী চলে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত। এর আগে, ৯ এপ্রিল পারিবারিক পরিসরে অনানুষ্ঠানিকভাবে তার নবম একক প্রদর্শনীর যাত্রা শুরু হয়। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরিবারের সদস্যদের সরব উপস্থিত এই প্রদর্শনীতে ভিন্নমাত্রা যোগ করে। 

প্রদর্শনীতে প্রবেশ করতেই ডান পাশের দেয়ালে টাঙানো ১৯৮৬ সালের তেলরঙের কাজ ‘খেলা, আমিও কি খেলছি’ (প্লে, এম আই) দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই কাজে শিল্পী পরিচিতদের বহুরূপিতা উন্মোচন করেছেন। ক্যানভাসে সংযুক্ত রয়েছে শিল্পীর বাবার ব্যবহৃত একটি আয়না-যা কাজটিকে দিয়েছে এক গভীর ব্যক্তিগত মাত্রা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভেতরে বেড়ে উঠলেও উদার মানসিকতাসম্পন্ন বাবার ছায়াতেই বেড়ে উঠেন এই শিল্পী যা তাকে এখনও মানসিকভাবে শক্তি দেয়। কিশোরী বয়স থেকে তার সংবেদনশীলতা, আত্মচেতনা এবং বিবেকবোধের বিকাশ তার চিত্রকর্মে শিল্পিত হয়ে উঠেছে।

শৈশবের স্মৃতি নিয়ে নির্মিত ‘চাইল্ডহুড মেমরি-১’ এবং ‘চাইল্ডহুড মেমরি-২’ (২০২২) শিরোনামের দুটি তেলচিত্রে ধরা পড়েছে আত্মিক শক্তির গভীরতা। বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে মানুষের অন্তর্গত শক্তিই যে অধিক স্থায়ী ও প্রভাবশালী-এই চিরন্তন সত্য শিল্পী তুলে ধরেছেন তার শৈশবস্মৃতির আলোকে।


অন্যদিকে, ‘টাইম অ্যান্ড স্টোরি লাইফ’ (সময় ও গল্প) এবং ‘ন্যাচার’ (প্রকৃতি) শিরোনামের ২০২১ থেকে ২০২৬ সময়কালের কাজগুলোতে শিল্পীর মনোজাগতিক দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাসী শিল্পভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রঙের ব্যবহারে এবং বিন্যাসে তার নিজস্ব চিন্তাশক্তির গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে।

এই প্রদর্শনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-দেশজ শিল্পের প্রতি শিল্পীর গভীর অনুরাগ। শেরপুরের শিল্পশিক্ষাবঞ্চিত শিল্পী জোসনা রাণী পালের তৈরি টেপাপুতুলও এখানে স্থান পেয়েছে। দেশজ শিল্পকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও পুনর্বয়নের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই অন্তর্ভুক্তি। এক প্রশ্নের জবাবে চ্যানেল 24 অনলাইনকে এই শিল্পী বলেন, ‘আমরা, যারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, মূলত জোসনা রাণীদের পূর্বপূরুষদের কাছ থেকেই মূল শিক্ষা পেয়েছি। প্রতিষ্ঠিত চিত্রশিল্পীদের পেছনে এই দেশজ শিল্পীদের পরোক্ষ অবদান সবচেয়ে বেশি। তারাই আমাদের প্রকৃত পথপ্রদর্শক।’

প্রচারণাবিমুখ এই নিভৃতচারী শিল্পী তার একক প্রদর্শনীর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচারণা চালাননি, এমনকি কোনো ব্রোশিওরও প্রকাশ করেননি। তার ভাষায়, ‘গণমাধ্যম থেকে আমি যথেষ্ট সাড়া পেয়েছি। আমার আর আলাদা করে প্রচারণার প্রয়োজন নেই। আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশজ ও লোকজ ধারার শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে যেতে চাই।’

শৈশবে দেখা ভালোবাসার উপাদানগুলোও সামিনা নাফিজের ক্যানভাসে ফিরে ফিরে আসে। তিনি সব সময়ই নতুন বর্ণ ও রূপের এক আবেশ সৃষ্টি করতে চান। সেই ধারাবাহিকতা বাংলা নববর্ষকে ঘিরে তার এই প্রদর্শনীতে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ৪২টি চিত্রকর্ম। ক্যানভাসজুড়ে ফুটে উঠেছে রঙিন হাতপাখা, শোলার বাঘ, পাখি, মুখোশ, ফুল, মাটির পুতুল এবং শখের হাঁড়ির মতো বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ উপাদান। প্রতিটি কাজে দেশজ শিল্পভাষা প্রাধান্য পেয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উজ্জ্বল রঙের সাহসী ব্যবহার।

কিছু কাজে কোলাজ পদ্ধতির প্রয়োগও লক্ষণীয়। তেল রংয়ে আঁকা ‘হ-য-ব-র-ল’ শিরোনামের কাজটি দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে।

১৯৬১ সালের ১৩ জুন জন্মগ্রহণ করেন সামিনা নাফিজ। চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ থেকে তার শিল্পশিক্ষার সূচনা। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে প্রথম বিভাগে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া এই শিল্পীর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পুতুল: বাংলার প্রাণ-প্রতিমা’, ‘চিত্রকলায় স্যুরিয়ালিজম’ এবং ‘ছবি আঁকি আর পড়ি’। পাশাপাশি শিশুতোষ বইয়ের অলংকরণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শীর্ষ পদে কর্মরত ছিলেন এই শিল্পী। 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..