ইরানি সমুদ্র মাইন যুক্তরাষ্ট্রকে চরম বিপাকে ফেলেছে

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৯, | ১৬:০৯:১২ |
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীতে ইরান মাইন স্থাপন শুরু করেছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ স্টিফেন সিলভারের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি বর্তমানে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরানের অস্ত্রাগারে ৫ হাজারের বেশি নৌ-মাইন রয়েছে এবং তাদের সামরিক কৌশলের একটি প্রধান অংশই হলো প্রয়োজনে এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের হুমকির সৃষ্টি হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মাইনগুলো অপসারণ বা নিষ্ক্রিয় করার জন্য বিশেষভাবে সক্ষম মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো বর্তমানে ঘটনাস্থল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছে। ইউএসএস ডালসা এবং ইউএসএস সান্তা বারবারা নামের দুটি 'ইন্ডিপেন্ডেন্স-ক্লাস লিটোরাল কমব্যাট শিপ' বর্তমানে এশিয়ার মালয়েশিয়ায় নোঙর করে আছে। এই জাহাজগুলোই ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মাইন-বিরোধী অভিযানের প্রধান ভরসা। গত বছর এভঞ্জার-ক্লাস মাইন হান্টার জাহাজগুলো অবসরে যাওয়ার পর এই দুটি রণতরীকেই বাহরাইনে মোতায়েন করার কথা ছিল কিন্তু বর্তমানে তাদের অবস্থান এশীয় অঞ্চলে শনাক্ত করা হয়েছে।

লিটোরাল কমব্যাট শিপগুলো মূলত অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সাজানো। এগুলো সমুদ্রের তলদেশের মাইন শনাক্ত এবং ধ্বংস করতে সক্ষম। এই জাহাজগুলোতে চালকবিহীন ড্রোন এবং বিশেষায়িত এমএইচ-৬০ সি হক হেলিকপ্টার থাকে, যা মাইনফিল্ড থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে কাজ করতে পারে। কিন্তু বর্তমান সংকটের মুহূর্তে এই সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের মাইন যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা একে বর্তমান সময়ের এক চরম সংকট হিসেবে অভিহিত করছেন।

ইরানের এই মাইন যুদ্ধের ইতিহাস বেশ পুরনো। এটি ১৯৮৭ সালের 'ট্যাঙ্কার ওয়ার'-এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় ইরানের নৌ-মাইন মার্কিন পতাকাবাহী কুয়েতি ট্যাঙ্কার 'ব্রিজেটন'-এ আঘাত হেনেছিল। যা পরবর্তীতে সরাসরি মার্কিন-ইরান সংঘাতের সূত্রপাত ঘটায়। ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির মতে, ইরান গত কয়েক দশকে তাদের এই মাইন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়েছে। বর্তমানে তারা কেবল সাধারণ কন্টাক্ট মাইন নয় বরং অত্যাধুনিক ইনফ্লুয়েন্স মাইনও তৈরি করছে। এগুলো জাহাজের চৌম্বকীয় বা শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

এদিকে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টায় মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছে না ওয়াশিংটন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, যুক্তরাজ্য সরাসরি কোনো রণতরী পাঠানোর পরিবর্তে কেবল মাইন-সুইপিং ড্রোন পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরাসরি জাহাজ পাঠালে এই অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান খোঁজা হচ্ছে যাতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

ন্যাটো মিত্রদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ অভিযোগ করেছেন যে, অধিকাংশ ন্যাটো সদস্য দেশ ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ন্যাটো দেশগুলোর সুরক্ষায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করলেও বিপদের সময় এই দেশগুলো পাশে দাঁড়াচ্ছে না। তিনি ন্যাটোকে একটি একতরফা সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের রক্ষা করে কিন্তু নিজের প্রয়োজনে কাউকে পায় না।

হরমুজ প্রণালীর বর্তমান অচলাবস্থা কেবল সামরিক নয় বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও এক ভয়াবহ বার্তা। এই জলপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। মাইন আতঙ্কে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, যদি দ্রুত এই মাইনগুলো পরিষ্কার করা না যায়, তবে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহন খরচ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পেন্টাগন এখন তাদের রণকৌশল নতুন করে সাজাতে বাধ্য হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত জাহাজগুলোকে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে ফিরিয়ে আনা হবে নাকি বিকল্প কোনো পন্থায় মাইন অপসারণ করা হবে, সে বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..