হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ইরানের তেল রপ্তানি অব্যাহত

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৮, | ২২:২৭:২১ |
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বর্তমানে কার্যত বন্ধ। তবে এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেই এক অভিনব ও চতুর কৌশলে নিজেদের তেল রপ্তানি সচল রেখেছে ইরান। সামুদ্রিক ও বাণিজ্য তথ্য প্ল্যাটফর্মগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে , গত ১৫ দিনে এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ৯০টি জাহাজ চলাচল করেছে, যার একটি বড় অংশই ছিল ইরানের নিজস্ব বা তাদের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর তেলবাহী ট্যাঙ্কার।

মেরিন ডেটা ফার্ম ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’ এবং ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে কমপক্ষে ৮৯টি জাহাজ এই বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ছিল বিশাল তেলের ট্যাঙ্কার।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের নিজস্ব উপকূলের খুব কাছ দিয়ে একটি ‘নিরাপদ করিডোর’ তৈরি করেছে, যা ব্যবহার করে তারা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। বাণিজ্য বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইরান ১৬ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও চীন এখন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

লয়েডস লিস্ট-এর এডিটর-ইন-চিফ রিচার্ড মিড জানিয়েছেন, এই জাহাজগুলোর অনেকগুলোই ছিল ‘ডার্ক ট্রানজিট’ বা ছায়া জাহাজ, যারা মূলত রাডার ফাঁকি দিয়ে চলাচল করে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রেডডালের ক্লায়েন্ট ডিরেক্টর কুন কাও বলেন, “হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ইরান যেমন তেলের বাজার থেকে মুনাফা লুটছে, তেমনি নিজের রপ্তানি পথটিও সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে।”

তদন্তে দেখা গেছে, ইরান কেবল নিজেদের জাহাজই নয়, বরং নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের জাহাজগুলোকেও এই পথ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। গত ১৫ মার্চ পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের ‘করাচি’ নামক একটি ট্যাঙ্কার এবং তার আগে ভারতের ‘শিভালিক’ ও ‘নন্দা দেবী’ নামক দুটি এলপিজিবাহী জাহাজ নিরাপদে এই প্রণালি পার হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর নিশ্চিত করেছেন, তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পরেই এই যাতায়াত সম্ভব হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক বিদেশি জাহাজ এখন ইরানি হামলা থেকে বাঁচতে নিজেদের ‘চীন-সংশ্লিষ্ট’ বা ‘সম্পূর্ণ চীনা ক্রুচালিত’ হিসেবে ঘোষণা করছে। ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে তারা এই ঝুঁকি এড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি আসলে সবার জন্য বন্ধ নয়; বরং ইরান এটি কেবল তাদের ‘শত্রু’ দেশগুলোর জন্য বেছে বেছে বন্ধ রেখেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের দাম কমানোর আশায় মিত্রদের ওপর যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে এই প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। তবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ইরানি ট্যাঙ্কারগুলোর চলাচলে কিছুটা নমনীয়তা দেখাচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “বিশ্বের বাকি অংশে তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে আমরা ইরানি জাহাজগুলোকে প্রণালি পার হতে দিচ্ছি।”

বর্তমানে ইরান হুমকি দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের এক লিটার তেলও এই পথ দিয়ে যেতে দেবে না। আইএনজি ব্যাংকের কৌশলবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালি এখন তেহরানের হাতে থাকা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্ত্র। তারা এই পথ দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচলের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত রেখে বিশ্ববাজারকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..