শেষ হতে যাচ্ছে তাকওয়ার প্রশিক্ষণের মাস পবিত্র রমজান। এ মাসে মুসলমানদের প্রতিটি দিন কেটেছে ইবাদতে ইবাদতে। প্রতিটি মুহূর্ত পার হয়েছে আমলের সৌরভের। জীবনের রুটিন বদলে গেছে ইবাদতের রুটিনে।
কিন্তু আমলের এই শ্রোতধারা কি শুধু রমজানেই সীমাবদ্ধ? না, বরং রমজানের পরও ইবাদত ও তাকওয়ার এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
আল্লাহ আমাকে দেখছেন এই মানসিকতায় রমজানে পানাহারসহ অনেক কিছু থেকে বিরত থাকা হয়। রমজানের বাইরেও সেই আল্লাহ আমাদের সবকিছু দেখেন। তাই প্রতিক্ষণ প্রতিটি কাজ আল্লাহ দেখছেন এই মানসিকতা বহাল রাখতে হবে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে জ্বালাতে হবে তাকওয়ার প্রদীপ।
পাপ পাপই। তা যে সময়ই করা হোক। রমজানে যেমন পাপ থেকে দূরে থেকেছি, রমজানের পরেও পাপের অন্ধকার থেকে দূরে থাকতে হবে।
রমজানে বহু ধরনের আমল ও নেক কাজ করেছি। রমজানের বাইরেও এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। কেননা পাপ থেকে দূরে থাকা এবং আমলের প্রয়োজনীয়তা শুধু রমজানেই সীমাবদ্ধ নয়। কারণ আমরা রমজানে যেমন আল্লাহর বান্দা রমজানের বাহিরেও আল্লাহর বান্দা।
রমজানে আমরা প্রতিদিন ২০ রাকাত তারাবি পড়ি। কিন্তু রমজানের পরে কেন পাঁচ ওয়াক্তে ১৭ রাকাত ফরজ নামাজ ছেড়ে দেই? সুন্নতে মুয়াক্কাদা তারাবির চাইতে ফরজের গুরুত্ব যে অনেক বেশি এ কথা কে না জানে? তাহলে ফরজের প্রতি এই উপেক্ষা কেন? অথচ কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এই নামাজের হিসাব হবে।
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে ঈদ। ঈদ এবং ঈদ পরবর্তী সময়ে অনেকে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে উঠে। অতি আনন্দে আত্মহারা এবং লাগামহীন হয়ে যায়। ভাবসাবে মনে হয় যেন দীর্ঘ কারা দহনের পর মুক্তি লাভ হয়েছে। শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের অপচয় ও আত্মপ্রকাশের প্রতিযোগিতা।
পোশাক পরিচ্ছদ, খাবার দাবার, পরস্পর দেখাসাক্ষাতে উপেক্ষিত হয় নৈতিকতা ও ধর্মীয় রীতি। পারিবারিক, সামাজিক এবং বিনোদন অনুষ্ঠানগুলোতে হালাল-হারামের তোয়াক্কা করা হয় না।
উৎসব বা আনন্দ ইসলামে নিষেধ নয়। একজন মুমিনের জীবন এবং ইবাদত বন্দেগী যেমন আল্লাহর হুকুমে নিয়ন্ত্রিত হয় তেমনিভাবে মুমিনের আনন্দ উৎসবও আল্লাহর হুকুমের নিয়ন্ত্রণাধীন ও সমর্থিত হতে হবে। উৎসব বা আনন্দের ক্ষেত্রে লাগামহীন এবং বেপরোয়া হওয়া যাবেনা। কারণ লাগামহীন উৎসব ও আনন্দের ক্ষেত্র দুনিয়া নয়।
এই দুনিয়াতে আল্লাহর হুকুমে জীবন কাটাতে হবে। তাহলেই আখেরাতে লাগামহীন আনন্দ উৎসব এবং অসীম চাহিদা পূরণের জান্নাত পাওয়া যাবে। কিন্তু দুনিয়াতে লাগামহীন এবং বেপরোয়া হলে পরকাল কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, জান্নাতে তোমাদের মন যা কিছুই প্রত্যাশা করবে তাই পাবে। (সূরা হা মীম আসসাজদা: আয়াত -৩১)
নবীজি ইরশাদ করেন, জান্নাতকে কষ্টদায়ক ও শ্রমসাধ্য বিষয় দিয়ে এবং জাহান্নামকে কু-প্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা দ্বারা বেষ্টন করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এ পৃথিবীতে খেয়াল খুশি বা মন যা চায় তা করা জাহান্নামী মানুষের কাজ। মুসলিম শরীফ: (৮/১৪২-১৪৩)
জান্নাতের অসীম নেয়ামত পেয়ে মানুষ পৃথিবীর সব দুঃখ ভুলে যাবে। কিন্তু জীবনে যে সময়টুকু আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অতিবাহিত হয়েছে এর জন্য আফসোস করবে । হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস। নবীজি বলেন, জান্নাতে যাওয়ার পর দুনিয়ার কোনো কিছুর জন্য জান্নাতিদের আফসোস থাকবে না। তবে শুধু ওই সময়ের জন্য আফসোস থাকবে, যা আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অহেতুক কাজকর্মে কেটেছে। (বায়হাকি, হাদিস: ৫০৯)
তাই কোনো উৎসব বা আনন্দ মূহুর্ত যেন মুমিনকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ না করে দেয়। যদি আল্লাহ থেকে বিমুখ হই তাহলে পরকালের অসীম জীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। শত আফসোস আর পরিতাপে যে ক্ষতির কোনো সমাধান হবেনা।
দুনিয়ার সুখ ও আনন্দ ক্ষনস্থায়ী। মুমিনের প্রত্যাশা অসীম জান্নাতের অনাবিল সুখ। তাই মুমিন দুনিয়ার আনন্দ ও বিলাসিতার ওপর জান্নাত প্রাপ্তিকে প্রাধান্য দেয়। জান্নাত অর্জনকে বড় অর্জন মনে করে। আর বড় কোনো অর্জন কি কঠোর সাধনা ও ত্যাগ ছাড়া সম্ভব হয় কখনো?
এ জাতীয় আরো খবর..