ইরানের রহস্য দ্বীপ কেশম: ওপরে জাদুঘর, নিচে মিসাইল সিটি

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৭, | ২১:২৯:০৯ |
হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপের গোলকধাঁধার মতো লবণের গুহা এবং পান্না রঙের ম্যানগ্রোভ বনের নিচে এক ভিন্ন ধরনের স্থাপত্য সমাহিত রয়েছে।

পর্যটকরা একসময় এই ‘উন্মুক্ত ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর’-এর অদ্ভুত সব পাথুরে গঠন দেখার জন্য ভিড় করত, কিন্তু বিশ্বের নজর এখন সেই প্রবালের নিচে যা লুকিয়ে আছে তার দিকে: ইরানের ‘ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহরগুলো’।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেশম দ্বীপটি তার মুক্ত-বাণিজ্য এবং পর্যটন স্বর্গ থেকে একটি সম্মুখ-সারির দুর্গে পরিণত হয়েছে—এবং বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে মোতায়েন করা মার্কিন মেরিনদের কাছে এটি একটি পরম কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু।

এর বিশাল আয়তন—প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ বর্গকিলোমিটার (৫৫৪ বর্গমাইল)—পারস্য উপসাগর থেকে প্রণালির প্রবেশমুখকে ঐতিহাসিকভাবেই শাসন করতে সাহায্য করে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পারাপার পথের একটি ছিপির মতো কাজ করে।

বর্তমানে দ্বীপটির ১লাখ ৪৮ হাজার বাসিন্দা—যাদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম এবং অনন্য 'বান্দারি' উপভাষায় কথা বলেন—এই প্রাচীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আধুনিক সামরিক উত্তেজনার সন্ধিক্ষণে বসবাস করছেন। তাদের জীবন এখনও সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রতি বছর 'নওরোজ সায়্যাদি' বা জেলেদের নববর্ষের মাধ্যমে উদযাপিত হয়; এই উৎসবে সাগরের দানকে সম্মান জানাতে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।

কিন্তু গত ৭ মার্চ—যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মাথায়—মার্কিন বিমান হামলা দ্বীপটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি শোধন প্ল্যান্টকে লক্ষ্যবস্তু করে। তেহরান এই হামলাকে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে একটি ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে, যার কারণে আশপাশের ৩০টি গ্রামে সুপেয় পানি সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এর দ্রুত প্রতিশোধ হিসেবে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বাহরাইনের জুফেয়ার ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। তাদের দাবি ছিল, কেশম দ্বীপে হামলাটি প্রতিবেশী একটি উপসাগরীয় দেশ থেকে চালানো হয়েছিল।

মিসাইল সিটি – প্রণালির দুর্গ

১৯৮৯ সাল থেকে মুক্ত বাণিজ্য-শিল্প অঞ্চলের মর্যাদার কারণে দ্বীপটির যে আধুনিক শিল্প অবয়ব তৈরি হয়েছে, তা আজ ইরানের ‘ডুবন্ত নয় এমন বিমানবাহী রণতরী’ হিসেবে এর ভূমিকার কাছে ম্লান হয়ে গেছে। বন্দর আব্বাস শহর থেকে মাত্র ২২ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত এই কেশম দ্বীপটি ক্লারেন্স প্রণালির (যা কুরান নামেও পরিচিত) ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের অসম নৌ-শক্তির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

দ্বীপের ভূগর্ভস্থ গোলকধাঁধায় কতগুলো ইরানি দ্রুতগামী আক্রমণকারী বোট এবং উপকূলীয় ব্যাটারি লুকানো আছে তার সঠিক সংখ্যা অত্যন্ত গোপনীয় হলেও, তাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট। 

লেবাননের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল এবং সামরিক বিশেষজ্ঞ হাসান জুনি বলেছেন, কেশমে একটি ভূগর্ভস্থ মিসাইল সিটি বা ক্ষেপণাস্ত্র শহরের ভেতরে বিস্ময়কর ইরানি সক্ষমতা মজুদ রয়েছে। 

জুনি বলেন, এই বিশাল নেটওয়ার্ক একটি প্রাথমিক লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে: হরমুজ প্রণালিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করে দেওয়া।

এবং তারা এটি সফলভাবে করতে পেরেছে। গত সপ্তাহে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায় যখন ইরান এই পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকারী জাহাজগুলোতে হামলার হুমকি দেয়। এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজকে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এদিকে বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব ট্যাঙ্কারের জন্য ইরানের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই জলপথ জোরপূর্বক উন্মুক্ত করার জন্য যুদ্ধজাহাজের একটি নৌ-বহর তৈরির চেষ্টা করছে।

কেশম যখন একবিংশ শতাব্দীর জ্বালানি যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, তখন এর নিস্তব্ধ লবণের গুহা এবং প্রাচীন মাজারগুলো মনে করিয়ে দেয় যে—পর্তুগিজ বা ব্রিটিশদের মতো অতীত সাম্রাজ্য এবং সামরিক জোটগুলো সময়ের সঙ্গে বিলীন হয়ে গেলেও, প্রণালির এই ভূতাত্ত্বিক দুর্গটি ইতিহাসের উত্তাল জোয়ারে আজও অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নানা নামের এক দ্বীপ

আরবিতে 'জাজিরা-আল-তবিলা' (দীর্ঘ দ্বীপ) নামে পরিচিত এই কেশমের পরিচয় গড়ে উঠেছে একের পর এক সাম্রাজ্যের হাত ধরে। এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা অনুসারে, গ্রিক অভিযাত্রী নিয়ার্কাস এটিকে 'ওরাকটা' হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং সেখানে ইরিথ্রিয়ান সাগরের নামকরণকারী ইরিথ্রাসের কিংবদন্তি সমাধি দেখেছিলেন। নবম শতাব্দীর মধ্যে ইসলামি ভূগোলবিদরা একে 'আবারকাওয়ান' নামে ডাকতেন, যা পরে লোকমুখে 'জাজিরা-ই গাভান' বা ‘গরুর দ্বীপ’ নামে পরিচিতি পায়।

দ্বীপটি কৌশলগতভাবে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল যে, ১৩০১ সালে তাতারদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে হরমুজের শাসকরা তাদের পুরো রাজদরবার সেখানে স্থানান্তরিত করেছিলেন। কয়েক শতাব্দী ধরে এটি এই অঞ্চলের ‘পানির ব্যারেল’ হিসেবে কাজ করেছে, যা পারস্য উপসাগরের পূর্ব দিকে অবস্থিত হরমুজের শুষ্ক রাজ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করত।

এই দ্বীপের ধন-সম্পদ এতটাই কিংবদন্তিতুল্য ছিল যে ১৫৫২ সালে অটোমান সেনাপতি পিরি রেইস এটি অভিযান চালিয়ে দখল করেন। সমসাময়িক বিবরণ অনুযায়ী তিনি যে সম্পদ জব্দ করেছিলেন তাকে ‘সারা বিশ্বের মধ্যে পাওয়া সবচেয়ে দামী পুরস্কার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

দ্বীপটির ঔপনিবেশিক ইতিহাসও সমানভাবে উত্তাল।

পর্তুগিজরা ১৬২১ সালে কেশমে একটি বিশাল পাথরের দুর্গ তৈরি করেছিল। এক বছর পর, পারস্য ও ইংরেজদের একটি যৌথ বাহিনী সেই দুর্গ থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে। সেই যুদ্ধে ব্রিটেনের বিখ্যাত আর্কটিক অভিযাত্রী উইলিয়াম ব্যাফিন প্রাণ হারান।
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে ব্রিটিশরা বাসিদুতে একটি নৌঘাঁটি স্থাপন করেছিল, যা ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল। ১৯৩৫ সালে ইরানের তৎকালীন শাহ রেজা শাহ পাহলভির অনুরোধে অবশেষে ব্রিটিশ কয়লা কেন্দ্রটি পরিত্যক্ত হয়।

আগুনের মুখে এক জাদুঘর

সামরিক ওয়াচটাওয়ার এবং আইআরজিসির ভূগর্ভস্থ সাইলোর বাইরেও কেশম মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরিবেশগত বৈচিত্র্যময় স্থান হিসেবে টিকে আছে। এটি 'হারা' ম্যানগ্রোভ বনের আবাসস্থল, যা পরিযায়ী পাখিদের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এছাড়া এখানে রয়েছে 'কেশম জিওপার্ক'—ইউনেস্কো স্বীকৃত এই অঞ্চলের প্রথম জিওপার্ক, যা ২০০৬ সালে এই সম্মাননা লাভ করে।

সূত্র: আলজাজিরা।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..