✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৭, | ১৬:২৯:২৬ |গাজা-তেহরানের দূরত্ব হাজার মাইলের বেশি হলেও সাম্প্রতিক ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় দেশ দুটির সাধারণ মানুষের জীবন এখন একই সুতোয় গেঁথে গেছে। গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল, ধূলিধূসরিত হাসপাতাল আর স্বজনহারা মানুষের আহাজারির যে করুণ দৃশ্য বিশ্ব গত দুই বছর ধরে দেখে আসছে, এখন তার হুবহু প্রতিফলন ঘটছে ইরানের রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে।
ইরানি নাগরিকরা এখন নিজেদের চোখের সামনে সেই একই ধ্বংসযজ্ঞ দেখছেন, যা এতদিন তারা কেবল টেলিভিশনের পর্দায় গাজার বাসিন্দাদের ওপর হতে দেখেছিলেন। এই যুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক সীমানাকেই রক্তাক্ত করেনি বরং মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের ভাগ্যকেও ভয়াবহ সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
তেহরানের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী হামেদ মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যদি এই যুদ্ধ আর কয়েকদিন অব্যাহত থাকে তবে তেহরানের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। তিনি আক্ষেপ করে জানান, গাজার ওপর চলা গণহত্যার ভিডিওগুলো যখন তারা দেখতেন, তখন ভাবতেও পারেননি কোনো একদিন তাদের ভাগ্যেও একই পরিণতি নেমে আসবে। অন্যদিকে গাজার ফিলিস্তিনিরা মনে করেন, তাদের ভূখণ্ড ছিল ইসরায়েলের জন্য একটি পরীক্ষাগার। গাজার শিক্ষক মুহাম্মদ আল-খালদি মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজায় ইসরায়েলের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা এখন ইরানের মতো জায়গায় একই দুঃসাহস দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা এখন যুদ্ধের এক নৃশংস কৌশলে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে জোড়া হামলায় ১৬৮ জন নিহত হওয়ার ঘটনা গাজার আল-তাবাইন স্কুলের সেই বিভীষিকাকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ভোরে নামাজের সময় হামলা চালিয়ে শতাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছিল। তেহরানের বাসিন্দা শিরিন প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধ শেষ হলে তাদের সন্তানরা কোথায় পড়াশোনা করবে। গাজার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ; সেখানে প্রায় ৯৭ শতাংশ স্কুল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কয়েক বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার এই পদ্ধতিগত ধ্বংস দুই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার ছায়া ফেলেছে।
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর আক্রমণ এই যুদ্ধের আরেক অমানবিক অধ্যায়। গাজার আল-শিফা হাসপাতালের করুণ দশার পর এখন ইরানের হাসপাতালগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। ইরানের আইভিএফ বা প্রজনন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে হামলার ফলে শত শত দম্পতি তাদের অনাগত সন্তানের ভ্রূণ হারিয়েছেন, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজার আল-বাসমা আইভিএফ সেন্টারের ধ্বংসযজ্ঞের হুবহু পুনরাবৃত্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গাজায় এখন কোনো কার্যকর হাসপাতাল অবশিষ্ট নেই। ইরানের বাসিন্দারাও এখন একই শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন যে, তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা হয়তো খুব শীঘ্রই পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর উপলব্ধির জন্ম হয়েছে। ইরানের মাশহাদের বাসিন্দা সারা যেমনটা বলছিলেন, ইসরায়েল ও তার মিত্রদের কাছে ইরান, লেবানন, সিরিয়া বা গাজা আলাদা কিছু নয়। তাদের প্রচার মাধ্যমগুলো প্রথমে হামলার স্বপক্ষে মিথ্যা আখ্যান তৈরি করে এবং পরে সুপরিকল্পিতভাবে বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ইরানে সহস্রাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, যুদ্ধের এই মরণখেলা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট সীমায় সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই শোক আর ধ্বংসের ভাষা এখন অভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: গালফ নিউ