পাহাড় আর সমুদ্রঘেরা পেরুর রাজধানী লিমায় রমজানের কোনো প্রকাশ্য ঘোষণা নেই, নেই মাইকে আজানের সুমধুর ধ্বনি। ১১ কোটি মানুষের এই কর্মব্যস্ত শহরে ট্রাফিক আর ব্যবসার চিরচেনা ছন্দে রমজান যেন এক শান্ত নীরবতা। তবে এই খ্রিষ্টানপ্রধান দেশটিতে কয়েক দশক ধরে টিকে আছে একনিষ্ঠ এক মুসলিম জনপদ, যাদের কাছে প্রতিটি রমজান হলো ধৈর্যের এক কঠিন পরীক্ষা।
পেরুর মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ৪০ লাখ। এর মধ্যে মুসলিমরা সংখ্যায় খুবই নগণ্য। সরকারি হিসব অনুযায়ী মাত্র ২ হাজার ৬০০ জন মুসলিম বসবাস করেন এখানে। এই ছোট্ট জনগোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার মানুষের বাস রাজধানী লিমায়। বাকি ৬০০ জন থাকেন চিলির সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলে।
লিমার ‘ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন’ মসজিদের ইমাম আহমেদ মোহাম্মদ (৩৬) বলেন, মধ্যপ্রাচ্য বা মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে রমজানে চারপাশ থেকে যে মানসিক ও আধ্যাত্মিক সমর্থন পাওয়া যায়, এখানে তা নেই। এখানে মানুষ নিজের মতো জীবন চালায়, অফিস-আদালত সব স্বাভাবিক থাকে। তাই আমাদের জন্য এটি ঈমানের এক বড় পরীক্ষা।
ইফতারে ভ্রাতৃত্ব
প্রশান্ত মহাসাগরের কোলঘেঁষা একটি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদে ইফতারের সময় নেমে আসে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। শুধু মুসলিম নন, মসজিদে ভিড় করেন কৌতূহলী প্রতিবেশীরাও। ইমামের মতে, ইসলামের অন্যতম শিক্ষা হলো মানুষের সেবা করা এবং খাবার ভাগ করে নেওয়া।
ইফতারের দস্তরখানে খেজুর ও শরবতের পাশাপাশি থাকে পেরুর ঐতিহ্যবাহী ‘এসকাবেচে’ (সিরকা ও পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করা মুরগির ঝাল পদ)। এখানে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মিসর, ভেনেজুয়েলা এবং পেরুর স্থানীয় মুসলিমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইফতার করেন। শুধু তাই নয়, রমজান মাসে লিমা ও এর আশপাশের প্রায় ২ হাজার দরিদ্র মুসলিম ও অমুসলিম পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহায়তা করে এই মসজিদ কর্তৃপক্ষ।
১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদটি এক সময় এক ফিলিস্তিনি পরিবারের মালিকানাধীন ছিল। মজার তথ্য হলো, পেরুতে ১৯ শতকের শেষের দিকে আরব অভিবাসীদের মাধ্যমে ইসলাম এলেও বর্তমানের মুসলিমদের প্রায় ৯৯ শতাংশই জন্মসূত্রে পেরুভিয়ান। তারা নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
তেমনই একজন আবু বকর। আমাজন অঞ্চলের উকায়ালি থেকে আসা এই যুবক ১৫ বছর আগে একদল পাকিস্তানি মুসলিমের সংস্পর্শে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, বিশাল ক্যাথলিক জনসমুদ্রের মাঝে আমাদের অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু ইসলাম আমাদের জীবনে যে পরিবর্তন এনেছে, তা আমাদের শান্তি দেয়।
পাকিস্তানের ফরিদ নাসিম ১৯৮০-এর দশকে ইনকা সভ্যতার টানে পেরুতে এসেছিলেন। তার মতে, পেরুর মানুষ মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে খুব একটা জানে না, তাই রমজান নিয়ে তাদের প্রচুর কৌতূহল।
ইমাম আহমেদ মোহাম্মদের ভাষায়, ইসলামে বর্ণ, ভাষা বা সীমান্ত কোনো বাধা নয়। এখানে সবাই সমান এবং আমরা সবাই মিলে এই দেশের মঙ্গল কামনায় ঐক্যবদ্ধ।
সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি
এ জাতীয় আরো খবর..