সালাতুত তাওবা পড়ার নিয়ম ও দোয়া

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৭, | ০১:১৭:৪০ |
মানুষ ভুল-ত্রুটি ও গুনাহ থেকে মুক্ত নয়। তবে ইসলামে গুনাহের পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্যে যে নফল নামাজ আদায় করা হয়, তাকে সালাতুত তাওবা বা তাওবার নামাজ বলা হয়। মুমিন মুসলমানের জন্য সালাতুত তাওবা বা তাওবার নামাজের ফজিলত, নিয়ম, তাওবা কবুলের সময়সীমা ও দোয়া ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো—


গুনাহ সংঘটিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব এই নামাজ আদায় করা উত্তম। আবার বিগত জীবনের গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে তাওবা করার নিয়তেও এই নামাজ পড়া যায়। ইসলামি ফিকহবিদদের মতে, তাওবার নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব।

তাওবার নামাজের ফজিলত

তাওবার নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। বিভিন্ন সাহাবায়ে কেরামও এই নামাজ আদায় করতেন।

হজরত আসমা ইবনুল হাকাম (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— আমি হজরত আলী (রা.)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, হজরত আবু বকর (রা.) আমাকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং তিনি সত্যই বলেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি—

مَا مِنْ عَبْدٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ، ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللَّهَ إِلَّا غَفَرَ اللَّهُ لَهُ

‘কোনো বান্দা যদি কোনো গুনাহ করে, তারপর উত্তমভাবে অজু করে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (আবু দাউদ ১৫২১)

এ কারণে মুসলমানের উচিত, কোনো গুনাহ হয়ে গেলে দেরি না করে দ্রুত আল্লাহর কাছে তাওবা করা।

তাওবা করার উত্তম পদ্ধতি

গুনাহ থেকে ক্ষমা লাভের একটি উত্তম উপায় হলো— উত্তমভাবে অজু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করা।

তাওবা কবুল হওয়ার সময়সীমা

মানুষের তাওবা মহান আল্লাহ কবুল করেন, তবে তিনটি বিশেষ মুহূর্ত উপস্থিত হওয়ার পর তাওবা গ্রহণ করা হয় না। এই তিনটি সময় হলো—

১. মৃত্যুর আগ পর্যন্ত

وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّىٰ إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الآنَ

‘তাদের জন্য তাওবা নয়, যারা গুনাহ করতে থাকে; অবশেষে যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলে—এখন আমি তাওবা করলাম।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১৮)

২. আল্লাহর আজাব এসে যাওয়ার আগ পর্যন্ত

حَتَّىٰ إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنْتُ...

‘যখন আজাব এসে যায় তখন তাওবা গ্রহণ করা হয় না।’ (সুরা আল-মুমিনুন: আয়াত ৮৫)

৩. পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়ের আগ পর্যন্ত

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন—

لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا

‘পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা থাকবে।’ (মুসলিম ৬৭৫৪)


তাওবার নামাজ পড়ার নিয়ম

তাওবার নামাজের পদ্ধতি হাদিসে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাহলো—

১. প্রথমে উত্তমভাবে অজু করবেন

২. এরপর একাগ্রচিত্তে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করবেন

৩. নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন

এই নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সুরা নির্ধারিত নেই। তাই সুরা ফাতিহার সঙ্গে কুরআনের যেকোনো সুরা পড়া যায়।

নামাজের সময় মনোযোগের গুরুত্ব

অজু ও নামাজের মাঝখানে অপ্রয়োজনীয় দুনিয়াবি কথা বা কাজ না করাই উত্তম। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ تَوَضَّأَ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ لَا يُحَدِّثُ فِيهِمَا نَفْسَهُ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

‘যে ব্যক্তি আমার মতো অজু করে, তারপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করে এবং এতে দুনিয়ার কোনো চিন্তা স্থান দেয় না, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ১৫৯)

তাওবার দোয়া

তাওবার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দোয়াগুলোর একটি হলো সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার। তাহলো—

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلٰى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা আনতা রব্বি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা। খালাকতানি, ওয়া আনা আবদুকা। ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতা‘তু। আউজু বিকা মিন শাররি মা সানাতু। আবু উ লাকা বিনি‘মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবু উ বিজাম্বি। ফাগফিরলি ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার সঙ্গে করা অঙ্গীকারের ওপর অটল থাকার চেষ্টা করি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আপনার অসংখ্য নিয়ামতের জন্য আমি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করছি। তাই আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই।’ (আবু দাউদ ৫০৭০)

সালাতুত তাওবা হলো গুনাহের পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। উত্তমভাবে অজু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আন্তরিকভাবে তাওবা করলে আল্লাহ তাআলার রহমতের দরজা উন্মুক্ত থাকে।

উল্লেখ্য, কারো যদি এই দোয়া মুখস্থ না থাকে, তবে সে নিজের ভাষায়ও আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে তাওবা করতে পারে। ইনশাআল্লাহ, মহান আল্লাহ বান্দার তাওবা কবুল করবেন।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..