ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের গ্রাম

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১১, | ১৯:০২:০২ |

‘তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়’—পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতার এই আহ্বান আজও যেন ডাকে শহরবাসীকে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে চাইলে ফরিদপুরের অম্বিকাপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে কবির বাড়ি ও কমপ্লেক্স হতে পারে অনন্য গন্তব্য।

১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর সদরের তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি জসীম উদ্দীন। ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে সমাহিত করা হয় ফরিদপুর শহরতলীর গোবিন্দপুর গ্রামে কুমার নদের পাড়ে পারিবারিক কবরস্থানে, এক ডালিম গাছের নিচে। ছায়া-সুনিবিড়, শান্ত পরিবেশে শুয়ে আছেন শ্যামল বাংলার এই কবি।

কবি তার ‘কবর’ কবিতায় ডালিম গাছের নিচে কবরের বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবে—‘এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে/ত্রিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’

কবিতার এ চিত্রকল্পই মূর্ত হয়ে উঠেছে কবির পারিবারিক এই কবরস্থানে। এ সমাধির কাছে দাঁড়িয়ে ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থীরা কিছুক্ষণ অবসর নিয়ে না দেখলে আসল কবিকেই যেন খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হয়ে উঠবে।

ফরিদপুরে রাত থাকার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় সার্কিট হাউস, সড়ক বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউস রয়েছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় রাত কাটানোর জন্য রয়েছে গোয়ালচামট মহল্লার হোটেল র‍্যাফেলস ইন, মুজিব সড়কের নীলটুলিতে পদ্মা হোটেল, হোটেল জে.কে. ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কয়েকটি হোটেল। সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সিঙ্গেল, এসি ও ডিলাক্স কক্ষের সুবিধা রয়েছে।

দেশীয় খাবারের জন্য শহরে রয়েছে আলীপুর মোড়ে পাঁচ তারা হোটেল, নীলটুলি মহল্লায় ধানসিঁড়ি হোটেল, সুপার মার্কেটের সামনে খন্দকার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। উন্নত সুবিধায় বাংলা খাবারের পাশাপাশি বিদেশি বিভিন্ন পদের খাবার পাওয়া যায় শহরের চরকমলাপুরে অবস্থিত সিরিন গার্ডেন রেস্টুরেন্ট, ঝিলটুলি মহল্লার ডোলসে ভিটা, টেরাকোটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, কাচ্চি ভাই, সুলতানস ডাইন ইত্যাদিতে। ৫০ থেকে ১০০ টাকায় এক বেলা খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে এ শহরে। শহরের রাজেন্দ্র কলেজের পাশে রাস্তার ধারে, আলীপুর ব্রিজের পাশে, অম্বিকা ময়দানের পাশে খুবই কম টাকায় নানান পদের খাবারের দেখা মেলে।

যা দেখবেন

প্রায় এক একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কবি জসীম উদ্দীনের বাড়িটি সেই অম্লান ইতিহাসের সাক্ষী, যেখানে দাঁড়ালে সরল গ্রামবাংলার নীরব সৌন্দর্য যেন আপনাকে আলিঙ্গন করে নেয়। মাটির গন্ধমাখা উঠোন, চারদিকে ছড়িয়ে থাকা পাখির ডাক, পুরোনো টিনের ঘর,কাঠের দরজা এবং সাদামাটা নির্মাণশৈলী—সবটাই যেন একটি জীবন্ত গল্প বলে। শতবর্ষ আগে এখানে কবি ও তার পরিবার কীভাবে জীবনযাপন করতেন, কীভাবে সকালে কুসুমের কোলাহলে দিন শুরু হতো—তার অনুভব মেলে প্রতিটি কোণে।

এই উঠোনেই হয়তো কবি ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতেন, হাসতেন কিংবা একাকিত্বে বসে পল্লীর বুকের নিঃশব্দ রূপগুলো অনুভব করতেন। ঘুরে বেড়ালে মনে হবে—কবির চোখের সামনে আজও সেই গ্রামের নদী, মাঠ, জোয়ার—সবকিছু একই রকম টিকে আছে। কবির কাব্যগুলো যেন এই মাটির সঙ্গেই আজীবন মিলেমিশে আছে।

এ ছাড়া, বাড়িটির প্রায় প্রতিটি ঘরের টিনের বেড়ার সঙ্গে কবির বিভিন্ন লেখা, ছোট ছোট গল্প, স্মৃতিকথা ও বিভিন্ন চিঠি এবং আলোকচিত্র ব্যানারে বড় প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাড়ির উত্তরে রাস্তার পাশে কবির কবরস্থান। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ থেকে ডালিম গাছের তলে চিরশায়িত রয়েছেন। কবির চারপাশে শায়িত রয়েছেন তার বাবা, মা, পত্নী, বড় ছেলে, বড় ছেলের স্ত্রীসহ তার ভাই, বোন, ভাগনে ও নাতনিরা। এই বাড়িতে ঢুকতে দর্শনার্থীদের দিতে হবে ২০ টাকা।

কবির বাড়ির পাশেই সরকারি উদ্যোগে চার একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে ‘পল্লীকবি জসীম উদ্দীন কমপ্লেক্স ও সংগ্রহশালা’, যা শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন ও সাহিত্যের এক জ্বলন্ত স্মৃতিকেন্দ্র। এই কমপ্লেক্সটি ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর গ্রামে কুমার নদীর তীরে নির্মিত হয়েছে এবং এতে কবির জীবনের নানা সময়চিত্র ও তার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তুলে ধরার লক্ষ্যে স্থায়ী প্রদর্শনী রয়েছে।

এখানে কবি জসীম উদ্দীনের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সামগ্রী, কবিকে প্রশংসা করে আরেক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজ হাতে লেখা চিঠি, কাজী নজরুল ইসলামের হাতে লেখা চিঠি, কবির হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, বিরল আলোকচিত্র, প্রকাশিত বই, নথি ও অন্যান্য স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে—যা দর্শনার্থীদের সামনে কবির জীবন ও কর্মের বাস্তব দিকগুলো তুলে ধরে। কমপ্লেক্সে গ্যালারি ভবন, লাইব্রেরি, অফিস ভবন ও উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চসহ মোট চারটি ভবন আছে, যেখানে অধ্যয়ন, আলোচনা ও অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

এই সংগ্রহশালাটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে এবং এখানে প্রায় ১৬০টির বেশি প্রদর্শিত নিদর্শন ও ৩৩টি সংরক্ষিত বস্তু রয়েছে, যা পল্লীকবির সাহিত্য, গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত স্মৃতি একসঙ্গে উপস্থাপন করে। কমপ্লেক্সটি ঘুরে দেখলে বোঝা যায় কেন জসীম উদ্দীনকে ‘পল্লীর কবি’ বলা হয়—তার সাহিত্য শুধু গ্রামবাংলার রূপই নয়, সেই মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনা, সংস্কৃতি ও সাহসকেও নতুন করে জীবন্ত করে তোলে। এ ছাড়া, কমপ্লেক্সের ভেতরে রয়েছে সুবিশাল মুক্তমঞ্চ।

সংগ্রহশালা সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। প্রশস্ত সবুজ চত্বর ও নিরিবিলি পরিবেশ পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর উপযোগী।

সংগ্রহশালার বিক্রয় সহকারী লুৎফর রহমান মোল্লা বলেন, এই সংগ্রহশালা নিয়ে দর্শনার্থীদের আগ্রহ ব্যাপক। বিশেষ কারণ ছাড়া এটি প্রতিদিনই খোলা থাকে। সাধারণ দিনে শতাধিক পর্যটক আসে। তবে ঈদ ও বিভিন্ন সরকারি ছুটিতে পর্যটক অনেক বাড়ে।

লেখক ও গবেষক মফিজ ইমাম মিলন বলেন, জসীম উদ্দীনকে জানতে হলে তার গ্রামে আসতে হবে। এখানকার প্রকৃতি ও পরিবেশেই তার কবিতার প্রাণ। তিনি বলেন, এই জায়গাটি আসলে সাহিত্য আর ঐতিহ্যের টান। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সুচয়নী’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘বাঙালীর হাসির গল্প’, ‘যে দেশে মানুষ বড়’—এমন অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে গেছেন পল্লীকবি। ‘কবর’ ও ‘আসমানী’ আজও পাঠকের মুখে মুখে ফেরে।

কেন যাবেন

ঈদের ছুটিতে গ্রামে ফেরা বা ভ্রমণের পরিকল্পনায় যারা আছেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে একদিনের শিক্ষামূলক ও আবেগঘন সফর। সাহিত্য, প্রকৃতি ও ইতিহাস—সব মিলিয়ে গোবিন্দপুরে পল্লীকবির স্মৃতিধন্য বাড়ি হয়ে উঠতে পারে আপনার ঈদের বিশেষ গন্তব্য।

এ ছাড়া, ঈদে ফরিদপুর শহরের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধলার মোড়ে পদ্মা নদীর পাড়, ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার বাইশরশি জমিদার বাড়িও ঘুরে দেখার মতো। ফরিদপুর শহরে গেলে বিশেষ কিছু খাবার আপনার নজর কাড়বে, যা খুবই জনপ্রিয়। এর মধ্যে বাগাটের দই, তেতুলতলার রসগোল্লার কথা না বললেই নয়। শহরের বাটা শোরুমের সামনের মামুনের চটপটি, আর কী পাইলাম মোড়ের কলিজার সিঙ্গারাও অনেকে পছন্দ করেন হালকা খাবার হিসেবে।

যেভাবে যাবেন

ফরিদপুর জেলা শহরের আলীপুর মোড় (জনতা ব্যাংক মোড়) থেকে গোবিন্দপুর গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার। এখান থেকে অটোরিকশা, ইজিবাইক বা রিকশায় ১৫–২০ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায়। জনপ্রতি রিকশা ভাড়া ২০–৩০ টাকা। ইজিবাইক রিজার্ভ নিলে ১৫০–২০০ টাকার মধ্যে যাওয়া সম্ভব।

ঢাকা থেকে গেলে পদ্মা সেতু হয়ে সরাসরি বাসে ফরিদপুর শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ডে বাস থামবে। সূর্যমুখী পরিবহন, গোল্ডেন লাইনসহ বিভিন্ন বাস ঢাকা-ফরিদপুর রুটে পদ্মা সেতু হয়ে চলাচল করে। এ ছাড়া, একই নামের বাস গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে ফরিদপুর নতুন বাসস্ট্যান্ডে যায়। বাসে ঢাকা থেকে ফরিদপুর যেতে ভাড়া লাগবে মানভেদে ৪০০–৫০০ টাকা।

এ ছাড়া, ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস, মধুমতি এক্সপ্রেস ও বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে ফরিদপুর আসতে পারবেন। ট্রেনে আসনভেদে ভাড়া লাগবে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা। ফরিদপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড ও ফরিদপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে শহরের আলীপুর ব্রিজের পাশ পর্যন্ত ৩০ থেকে ৫০ টাকা রিকশা ভাড়ায় কবির বাড়ি ও সংগ্রহশালায় সহজেই যাওয়া যায়।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..