বছরে কয়েকদফা আগুনের সঙ্গে লড়াই করা কড়াইল বস্তিবাসী এবার আশা দেখছেন ফ্যামিলি কার্ডে। নতুন ঘর নির্মাণ ও নিত্যদিনের সংসার চালাতে ঋণে জর্জরিত এসব মানুষ স্বপ্ন দেখছেন ঘুরে দাঁড়ানোর। তাদের প্রত্যাশা, ফ্যামিলি কার্ডের মাসিক অর্থ ঋণ এবং জীবিকার লড়াই কিছুটা সহজ করবে। আগামীকাল মঙ্গলবার (১০ মার্চ) কড়াইল থেকেই ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রায় লাখ খানেক মানুষের শেষ আশ্রয় কড়াইল বস্তি। গত দুই দশকে অন্তত ২০ থেকে ২৫ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এই এলাকায়। ফলাফল নিম্ন আয়ের মানুষদের সর্বস্ব হারানো হাহাকার। সবশেষ, গত বছরের ২৫ নভেম্বর ভয়াবহ আগুনে পনেরশো ঘর ভস্মীভূত হয়েছে।
সাড়ে তিন মাস আগে লাগা আগুনের ক্ষয়ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি অধিকাংশ বাসিন্দা। কড়াইল বস্তির বিভিন্ন জায়গায় এখনও ধ্বংসস্তূপ দেখা যায়। তার মধ্যেই চলছে জীবন-জীবিকার লড়াই।
কড়াইল বস্তির ঘরে ঘরে পরিশ্রমী ও উদ্যমী নারী বাস করে। প্রায় পঞ্চাশ হাজার নারীর অধিকাংশই কর্মজীবী। বেশিরভাগের হাতে সংসারের হাল। কিছুদিন আগে যেখানে আগুনে ভস্মীভূত হয়েছিল এখানকার ঘর সেখানেই মানুষ আবারও স্বপ্ন দেখছেন ঘুরে দাঁড়ানোর। সেই স্বপ্নে নতুন পালক যোগ করছে ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ। তারা আশা করছেন, যথাযথভাবে এই সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
এখানকার বাসিন্দা ফিরোজা বেগম আবারও মাথা গোঁজার ব্যবস্থা নিশ্চিতের জন্য ঋণ করে ঘর তুলছেন। এখানকার আরেক বাসিন্দা গৃহিণী জবেদা। পাঁচ জনের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনিই। তার অবস্থাও অনেকটা ফিরোজা বেগমের মতোই।
বছরে কয়েকবার আগুনের সঙ্গে লড়াই আর তিন বেলা খাবার নিশ্চিত করা যখন মূল ভাবনা, তখন পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য ওষুধ কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও রীতিমতো দুঃসাধ্য। এসব মানুষদের মনে কিছুটা আশা দেখাচ্ছে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প। এরইমধ্যে সরকারি সহায়তার প্রয়োজনীয় ফরম পূরণ করেছেন তারা। স্থানীয়রা বলেন, মাসে ২৫০০ কিংবা ১০০০ টাকা পেলেও সংসার খরচে কিছুটা সাহায্য হবে।
এদিকে, আগামী ১০ মার্চ কড়াইল বস্তি থেকেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের ১৪টি স্থানে কর্মসূচির উদ্বোধনও ঘোষণা করবেন তিনি। ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডের উদ্যোগ নেয়ায় খুশি নিম্ন আয়ের মানুষরা। অনেকেই স্বপ্ন দেখছেন কিছুটা সঞ্চয় বা ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির।
তারা বলছেন, মাসে ২০০০ টাকা অনেকের ওষুধের খরচই লাগে। টাকা যদি পাওয়া যায়, তাহলে ওষুধের খরচ মেটানো যাবে। আমরা একটু বাঁচতে পারব, চলতে পারব, ওষুধ-খাবার সামলাতে পারব।
গবেষকরা মেগা প্রজেক্টের পরিবর্তে ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মুহাম্মদ সওগাতুল ইসলাম বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। রাষ্ট্র তার রিসোর্সকে সরাসরি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ব্যয় করবে। যে সিলেকশন এবং প্রসিডিউর আছে, তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে করা উচিত। এই জায়গায় অনেক রকম জালিয়াতি ও দুর্নীতি হয়, যা আমাদের সংশয় ও সন্দেহে ফেলে দেয়। ফলে কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতায় জোর দিতে হবে।’
নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের ‘মা’ বা নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা হবে। পাইলট পর্যায়ে প্রতিটি পরিবারকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেবে সরকার। অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..