মানুষের চরিত্র গঠনে কথার ভূমিকা অপরিসীম। একটি সত্য মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে, আর একটি মিথ্যা ধীরে ধীরে সেই অন্তরের আলো নিভিয়ে দেয়। জীবনের প্রতিটি মোড়ে মানুষ সত্য ও মিথ্যার এক সূক্ষ্ম পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই ঈমানের দাবি, আর ব্যর্থ হওয়াই আত্মিক পতনের সূচনা।
সত্য ও মিথ্যার এই নৈতিক পরিণতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হাদিসে আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘সত্য নেকির দিকে পরিচালিত করে আর নেকি জান্নাতে পৌঁছায়। আর মানুষ সত্যের ওপর কায়িম থেকে অবশেষে সিদ্দিকের দরজা লাভ করে। আর মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়, পাপ তাকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা কথা বলতে বলতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মহামিথ্যাচারী প্রতিপন্ন হয়ে যায়। ’(বুখারি, হাদিস : ৬০৯৪)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবজীবনের নৈতিক অভিযাত্রাকে এক দীর্ঘ পথচলার রূপে তুলে ধরেছেন। এখানে সত্য ও মিথ্যা কোনো বিচ্ছিন্ন আচরণ নয়, বরং এগুলো এমন দুটি পথ, যার প্রতিটির শেষপ্রান্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন গন্তব্যে গিয়ে মিশেছে—একটি জান্নাতে, অন্যটি জাহান্নামে।
সত্যবাদিতা ইসলামে শুধু মুখের কথা নয়; এটি অন্তরের দৃঢ়তা, চরিত্রের স্বচ্ছতা ও জীবনের নীতিগত অবস্থান। মানুষ যখন সত্যকে আঁকড়ে ধরে, তখন সত্য তাকে নেক আমলের পথে নিয়ে যায়।
আর নেক আমল ধীরে ধীরে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, হৃদয়কে আলোকিত করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে জান্নাতের পথে পৌঁছে দেয়। এই ধারাবাহিকতা এতটাই শক্তিশালী যে একসময় সত্যবাদিতাই মানুষের পরিচয় হয়ে ওঠে। তখন সে আর শুধু সত্যবাদী নয়, বরং আল্লাহর দরবারে সে ‘সিদ্দিক’ তথা পরম সত্যনিষ্ঠদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়।
পবিত্র কোরআনুল কারিমেও সত্যবাদীদের এই উচ্চ মর্যাদার কথা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা : আত-তাওবা, আয়াত : ১১৯)
অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যেদিন সত্যবাদীদের সত্য তাদের উপকারে আসবে।’ (সুরা : আল-মায়িদা, আয়াত: ১১৯)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, সত্য শুধু দুনিয়ায় সম্মানই এনে দেয় না, বরং আখিরাতেও তা মুক্তির প্রধান অবলম্বন।
অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যার পরিণতি সম্পর্কে যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, তা যেন আত্মার গভীরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। মিথ্যা মানুষকে প্রথমে একটি পাপের দিকে ঠেলে দেয়, তারপর সেই পাপ আরেকটি পাপের জন্ম দেয়। এভাবে মিথ্যা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়, আর অভ্যাস রূপ নেয় চরিত্রে। একসময় মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না, সে আর সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারছে না। অবশেষে আল্লাহর দরবারে তার পরিচয় স্থির হয়ে যায় ‘কাজ্জাব’ বা মহামিথ্যাবাদী হিসেবে।
পবিত্র কোরআনে এই ভয়াবহ পরিণতির দিকেই ইঙ্গিত করে বলে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে পথ দেখান না, যে সীমা লঙ্ঘনকারী ও মহামিথ্যাবাদী।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ২৮)
অন্য এক আয়াতে আরো কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস সেই সব লোকের জন্য, যারা মিথ্যা রটনা করে।’ (সুরা : আজ্জারিয়াত, আয়াত : ১০)
মিথ্যার সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি : যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, খিয়ানত করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৩; মুসলিম, হাদিস : ৫৯)
এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয় যে মিথ্যা শুধু একটি গুনাহ নয়, বরং এটি ঈমানের জন্যও মারাত্মক হুমকি।
অতএব, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ জীবনাচার যাচাই করে দেখা উচিত আমরা কোন পথে হাঁটছি—সত্যের পথে, নাকি মিথ্যার পথে? কারণ সত্য মানুষকে ধীরে ধীরে জান্নাতের দরজায় পৌঁছে দেয় আর মিথ্যা মানুষকে অজান্তেই জাহান্নামের কিনারায় ঠেলে দেয়। একজন মুমিনের জন্য তাই সত্যবাদিতা কোনো ঐচ্ছিক গুণ নয়, বরং এটি ঈমানের অনিবার্য দাবি, চরিত্রের মৌলিক স্তম্ভ এবং মুক্তির প্রধান চাবিকাঠি।
এ জাতীয় আরো খবর..