শীতের সকাল মানেই ভারী চোখ, বিছানা ছাড়তে অনীহা আর সারা দিন একধরনের অবসন্নতা—এ অভিজ্ঞতা অনেকেরই পরিচিত। পর্যাপ্ত ঘুমের পরও শরীর যেন ঠিকমতো সাড়া দিতে চায় না। ছুটির দিনে তো মনে হয়, সারা দিন কম্বলের নিচেই কাটিয়ে দেওয়া যায়! আসলে শীতের আবহাওয়া আমাদের শরীরের স্বাভাবিক জৈব ছন্দে প্রভাব ফেলে, যার ফলে এনার্জি কমে যাওয়া, মন খারাপ লাগা বা ঝিমুনি বেড়ে যেতে পারে।
এই সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হতে পারে সূর্যালোকের অভাব।
শীতকালে দিন ছোট হয়, সূর্যের আলোও কম সময় পাওয়া যায়। সূর্যের আলো আমাদের শরীরে সেরোটোনিন নামের ‘ফিল-গুড’ হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। আলো কম পেলে সেরোটোনিনের মাত্রা কমে যায়, ফলে মন খারাপ, অলসতা ও ঘুমঘুম ভাব বাড়ে। একই সঙ্গে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যেতে পারে, যা ঘুমের প্রবণতা বাড়ায়।
তাই সকালে ঘুম থেকে ওঠা কঠিন মনে হয়।
ঠাণ্ডা আবহাওয়া শরীরের মেটাবলিজমেও প্রভাব ফেলে। শীতে শরীর নিজের তাপমাত্রা ধরে রাখতে বেশি শক্তি ব্যয় করে। এতে দ্রুত ক্লান্তি আসতে পারে।
অনেক সময় সকালে রক্ত সঞ্চালনের গতি কিছুটা কম থাকায় শরীর ভারী লাগে এবং কাজে মন বসাতে সময় লাগে।
শীতকালে ঘুমের রুটিনও বদলে যায়। রাত দীর্ঘ হওয়ায় অনেকেই বেশি সময় ঘুমান। কম্বলের উষ্ণতায় ঘুম গভীর হয় ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত ঘুম শরীরকে আরো অবসন্ন করে দিতে পারে। ফলে সকালে মাথা ভার লাগা, মনোযোগ কমে যাওয়া বা ঝিমুনি অনুভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও এই ক্লান্তিভাবের পেছনে ভূমিকা রাখে। শীতে সাধারণত ভারী, তেল-মসলাযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া হয়, আর পানি ও শাক-সবজি তুলনামূলক কম খাওয়া হয়। এতে হজমে সমস্যা, গ্যাস ও শরীর ভারী লাগার প্রবণতা বাড়ে। পর্যাপ্ত পানি না খেলে ডিহাইড্রেশন হয়, যা এনার্জি কমিয়ে দেয়।
ভিটামিন ডি-এর অভাবও শীতের ক্লান্তির একটি বড় কারণ হতে পারে। সূর্যালোক কম পাওয়ায় শরীরে এই ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে পেশি দুর্বল লাগে, সহজে ক্লান্তি আসে এবং সারা দিন গা ঝিমঝিম করতে পারে। পাশাপাশি হাড়ে ব্যথা, বিশেষ করে হাঁটু বা কোমরে অস্বস্তি বাড়তে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে গিয়ে সর্দি-কাশি বা সংক্রমণ বাড়তে পারে। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে, ফলে মন খারাপ, হতাশা ও কর্মশক্তি কমে যেতে পারে।
শীতকালে শারীরিক পরিশ্রম বা নড়াচড়া কমে যাওয়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ঠাণ্ডার কারণে অনেকেই ব্যায়াম বা বাইরে হাঁটাহাঁটি কম করেন। এতে রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়, কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি ঠিকমতো পৌঁছায় না এবং সহজেই ক্লান্তি ভর করে। নিয়মিত শরীরচর্চা না করলে মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায় এবং শরীর ভারী লাগে। একই সঙ্গে ব্যায়ামের সময় নিঃসৃত এন্ডোরফিন কমে গেলে মন খারাপ, অলসতা ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, শীতের সকালে ক্লান্ত লাগা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। তবে নিয়মিত সূর্যের আলো গায়ে লাগানো, হালকা ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাবার খাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময় ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখলে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। শরীরের সংকেত বুঝে চলাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় উপায়।
সূত্র : এই সময়
এ জাতীয় আরো খবর..