বর্তমান সময় প্রায়ই বিভিন্ন প্রাণীর প্রতি নির্মমতার খবর আমাদের চোখে পড়ে। কখনো প্রয়োজনের অজুহাতে, কখনো অপ্রয়োজনে, আবার কখনো নিছক খেলাচ্ছলেও নির্বাক প্রাণীদের ওপর নির্দয় আচরণ করা হচ্ছে, তাদের কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, এমনকি মেরেও ফেলা হচ্ছে। অথচ ইসলাম এসবের ঘোর বিরোধী। ইসলামে মানুষকে যেমন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসাবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তেমনি আল্লাহতায়ালার অন্যান্য সৃষ্ট জীব বিশেষত প্রাণিকুলের প্রতিও দায়িত্বশীল, মানবিক ও দয়ালু আচরণের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলাম একদিকে মানুষের প্রয়োজনে প্রাণী থেকে বৈধ উপকার গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে, অন্যদিকে তাদের প্রতি অবহেলা, জুলুম ও কষ্ট দেওয়াকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
কুরআনে প্রাণিকুলের মর্যাদা
পবিত্র কুরআনের দিকে তাকালেই প্রাণীদের প্রতি ইসলামের দয়ালু দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা অনুধাবন করা যায়। কুরআনের একাধিক সূরার নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রাণী ও প্রাণি সম্পর্কিত বিষয়ের নামে যেমন-বাকারাহ (গাভি), আন’আম (চতুষ্পদ জন্তু), নাহল (মৌমাছি), নামল (পিঁপড়া), আনকাবুত (মাকড়সা) এবং ফিল (হাতি)।
এসব নামকরণ নিছক কাকতালীয় নয়; বরং এর মাধ্যমে এ বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, প্রাণিকুলও আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি এবং তাঁর কুদরতের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তারা অবহেলিত নয়; বরং আল্লাহর দৃষ্টিতে সম্মানিত।
নবীজির শিক্ষা
হজরত আবদুল্লাহ ইবন জাফর (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) এক আনসারি সাহাবির বাগানে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। নবী করিম (সা.)কে দেখে উটটি কাঁদতে শুরু করল, তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্নেহভরে উটটির কাছে গিয়ে তার ঘাড় ও পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। এতে উটটি শান্ত হয়ে গেল।
এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই উটের মালিক কে?’ একজন আনসারি যুবক সামনে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এটি আমার।’ তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাকে এই নির্বাক প্রাণীর মালিক বানিয়েছেন; এর ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না? এ উটটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখ এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করাও।’ (আবু দাউদ : ২৫৪৯।)
এ হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, প্রাণী কথা বলতে না পারলেও আল্লাহতায়ালা তাদের কষ্ট ও অভিযোগ অবগত করাতে সক্ষম। আর সেই কষ্টের জন্য মানুষকে একদিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
প্রাণীর ওপর জুলুম
ফিকহে হানাফির প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আদ-দুররুল মুখতার-এ উল্লেখ করা হয়েছে, গরু, গাধা কিংবা অনুরূপ কোনো প্রাণী দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রে শর্ত হলো, তাকে অতিরিক্ত কষ্ট দেওয়া যাবে না এবং প্রহার করা যাবে না। কারণ প্রাণীর ওপর জুলুম করা জিম্মি (ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিম নাগরিক)-এর ওপর জুলুম করার চেয়েও গুরুতর অপরাধ; আর জিম্মির ওপর জুলুম করা একজন মুসলমানের ওপর জুলুম করার চেয়েও ভয়াবহ। (রদ্দুল মুহতার : ৯/৪৯১।) এটি ইসলামে প্রাণীর অধিকারের গুরুত্ব কতটা গভীর-তার একটি জোরালো প্রমাণ।
প্রাণীর আরামের অগ্রাধিকার
হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘আমরা সফরে গেলে ততক্ষণ পর্যন্ত নফল বা সুন্নত নামাজ পড়তাম না, যতক্ষণ না উটের পিঠ থেকে বোঝা নামিয়ে তাকে আরাম দিতাম।’ (আবু দাউদ : ২৫৫১।) এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের নফল ইবাদতের আগেও ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত প্রাণীর বিশ্রামকে অগ্রাধিকার দিতেন।
সওয়াব ও মাগফিরাতের মাধ্যম
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি পথ চলছিল। পথিমধ্যে সে প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ে। অবশেষে একটি কূপ খুঁজে পেয়ে সে তাতে নেমে পানি পান করে। পরে সে দেখে, একটি কুকুর তৃষ্ণায় হাঁপাচ্ছে এবং ভেজা মাটি চাটছে। লোকটি ভাবে, কিছুক্ষণ আগে সে নিজেও এমন কষ্টেই ছিল। এ উপলব্ধি থেকে সে আবার কূপে নামে, নিজের চামড়ার মোজায় পানি ভরে ওপরে উঠে আসে এবং কুকুরটিকে পান করায়। আল্লাহতায়ালা তার এ দয়ার কাজ কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন।
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! পশুপাখির সেবায়ও কি সওয়াব রয়েছে?’ তিনি (সা.) বললেন, ‘প্রত্যেক প্রাণবান সত্তার সেবার মধ্যেই সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি : ২৩৬৩।)
আরেক হাদিসে এসেছে, একটি পাপিষ্ঠ নারী শুধু একটি কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করেছিল। (সহিহ বুখারি : ৩৩২১।)
নিষ্ঠুরতা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
ইসলামে প্রাণীকে ক্ষুধার্ত রাখা, জীবন্ত অবস্থায় কোনো অঙ্গ কেটে ফেলা, তীর বা পাথরের নিশানা বানানো, প্রাণীদের মধ্যে লড়াই লাগানো, সন্তানকে মা থেকে বিচ্ছিন্ন করা, মুখে আঘাত বা দাগ দেওয়া-এসব কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি একটি বিড়ালকে অনাহারে মারার কারণে এক নারীকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, এ কথাও হাদিসে বর্ণিত আছে। (সহিহ মুসলিম : ২২৪২।)
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাণীর প্রতি দয়া শুধু নৈতিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; বরং এটি ইমানের পরিপূর্ণতার অংশ এবং পরকালের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের কারণ। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা যেমন আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তির কারণ, তেমনি দয়া, সেবা ও সহানুভূতি আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের মাধ্যম।
তাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে আমাদের দায়িত্ব প্রাণিকুলের প্রতি দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও দয়ালু হওয়া। কারণ এ নির্বাক সৃষ্টিরাও আল্লাহর দরবারে ন্যায়বিচার পাবে।
এ জাতীয় আরো খবর..