আজ থেকে পাঁচ দশক আগেও দেশের মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত নীল-সোনালি রঙের চমৎকার ‘ময়ূর’ পাখিটি। তবে বাসস্থান, খাদ্যের অভাব, মানুষের নির্দয় অচরণসহ নানা কারণে তাদের বিচরণ আগের মতো চোখে পড়ে না।
অথচ এক সময় ময়ূরের পেখম তোলা নাচ মানুষকে মোহিত করতো। বিষেজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রাণীর প্রতি মানুষের আচরণ মানবিক না হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
জানা গেছে, ময়ূর (ফ্যাজিয়ানিডি) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত বড়, সুন্দর এবং আকর্ষণীয় রঙ্গের একটি পাখি। ইংরেজিতে পুরুষ ময়ূরকে পিকক এবং স্ত্রী ময়ূরকে পিয়েন বলা হয়ে থাকে। পুরুষ ময়ূরের মাথায় থাকে একটি মুকুট, মাথার দুপাশ সাদাটে, পালকবিহীন। ময়ূরের পালক অসাধারণ উজ্জ্বল, ধাতব আভাযুক্ত সবুজ ও নীল রঙের। লেজের উপরিভাগের পালকগুলো লম্বা। পেখম মেললে এর দৈর্ঘ্য হয় এক মিটারের বেশি হয়। তামাটে-সবুজ ও নীল রঙের সংমিশ্রণে সজ্জিত চওড়া পালকে অলঙ্কৃত থাকে রঙিন চোখের মতো বড় বড় ফোটা দাগ।
স্ত্রী ও পুরুষের প্রণয় মিলনের সময় মেলানো পেখমের আন্দোলন চমৎকার দেখায়। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ ময়ূর বিশেষ ধরনের কর্কশ সুরে ডাকে। পুরুষ ময়ূর বহুগামী। প্রতিটি পুরুষ ময়ূর চার-পাঁচটি স্ত্রী ময়ূরকে একসঙ্গে নিজের অধিকারে রাখতে পরে।
সাধারণত এদের প্রজনন কাল জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস। তবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরেও এদের প্রজনন ঘটে। স্ত্রী ময়ূর সাধারণত ফোটা দাগবিশিষ্ট চার থেকে ছয়টি ডিম পাড়ে এবং সেটি থেকে বাচ্চা ফুটতে ২৬ থেকে ২৮ দিন সময় লাগে। ছোট বাচ্চাগুলো মুরগির বাচ্চার মতোই মায়ের সাথে ঘুরে ঘুরে খাবার খায়। বিপদ দেখলেই মায়ের ডানার নিচে এসে লুকায়। ছোট বাচ্চারা মুরগির বাচ্চার মতোই মায়ের পালকের আড়ালে, আবার কখনবা পিঠের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করে।
বন্য ময়ূর সর্বভক্ত, চারা গাছের অংশ থেকে শুরু করে ঘাস, ফল-ফলাদি, শস্যদানা, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, পোকা-মাকড়, উভচর প্রাণী, বীজের খোসা, ফুলের পাপড়ি এবং কীটপতঙ্গ যেমন-পিঁপড়া, ঝিঁঝিঁ পোকা, কাঠ পোকা, বিছা পোকা, ছোট ছোট সন্ধিপদ প্রাণীসহ ইত্যাদি খাবার খেয়ে থাকে। এরা খাবার সঞ্চয় করে রাখে এবং পরে সেগুলো খায়। স্ত্রী ময়ূরকে আকৃষ্ট করার জন্য পুরুষ ময়ূর পেখম তোলে। এ কারণেই এরা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। চার প্রজাতির ময়ূরের কথা শোনা যায়। সেগুলো হচ্ছে নীল ময়ূর, সবুজ ময়ূর,কঙ্গোময়ূর ও সাদা ময়ূর।
গত ১০ জানুয়ারি পাশ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে একদল ময়ূর এসেছিল কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায়। বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রজাতির ময়ূর ছিল এগুলো। খবর পেয়ে স্থানীয়রা শিকার করতে গেলে ময়ূরগুলো আরও উড়ে চলে যায়।
এসময় আহত অবস্থায় একটি ময়ূরকে উদ্ধার করে উলিপুর উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ। পরে এটিকে রংপুরের বন বিভাগের পাঠানো হয়। বর্তমানে ময়ূরটিকে গাজীপুর সাফারি পার্কে রাখা হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় বনবিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা স্মৃতি সিংহ রায় বলেন, আজ থেকে চার-পাঁচ দশক আগেও গাজীপুর, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ময়ূর দেখা যেতে। বাসস্থান, খাদ্য সংকটসহ নানান কারণে পাখিটি আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রাণীর প্রতি মানুষের আচরণ মানবিক না হলে ধীরে ধীরে আরও অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..