ক্ষুধা পেলে অনেকেই রেগে যান, এটা কি স্বাভাবিক নাকি রোগের ইঙ্গিত?

ছোট শিশুরা এখনো শরীরের সব সংকেত বুঝে উঠতে পারে না। খেলাধুলা বা আশপাশের উত্তেজনায় তারা ক্ষুধা টেরই পায় না। ফলাফল হঠাৎ কান্না, রাগ, জেদ। ছবি: সংগৃহীত

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০১-১৭, | ১৯:০৩:৪৩ |
অফিসে দীর্ঘ মিটিং চলছে। ঘড়ির কাঁটা দুপুর পেরিয়েছে। একজন সহকর্মী হঠাৎ বিরক্ত হয়ে উঠছেন, কথা কাটাকাটি করছেন আরেকজন কিন্তু একই অবস্থায়ও শান্ত। দুজনেরই তো পেট খালি। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? আমরা প্রায়ই বলি, ক্ষুধা পেয়েছে বলেই এমন করছে। আজকাল এর জন্য একটা জনপ্রিয় শব্দও আছে হ্যাংরি। শব্দটা শুনতে মজার হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে মস্তিষ্ক, শরীর আর আবেগের জটিল সম্পর্ক।

মজার বিষয় হলো, মানুষ হাজার বছর ধরে ক্ষুধা আর রাগের এই যোগসূত্র অনুভব করলেও “হ্যাংরি” শব্দটি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে জায়গা পেয়েছে মাত্র ২০১৮ সালে। অথচ ক্ষুধা কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন মুড বদলে দেয় তা নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।

এতদিন মনে করা হতো, রক্তে শর্করা কমে গেলেই মানুষ খিটখিটে হয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ব্যাপারটা এতটা সহজ নয়। গবেষণায় ৯০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে এক মাসের জন্য লাগানো হয় কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর। এই যন্ত্র কয়েক মিনিট পরপর জানায় শরীরের গ্লুকোজের মাত্রা যা আমাদের মস্তিষ্কের প্রধান জ্বালানি। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা দিনে দুবার মোবাইলে জানাতেন তারা কতটা ক্ষুধার্ত এবং তাদের মেজাজ কেমন।

ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। দেখা যায়, রক্তে শর্করা কম থাকলেই সবার মেজাজ খারাপ হয়নি। বরং যারা নিজেরা বুঝতে পেরেছে যে তারা ক্ষুধার্ত, তারাই বেশি বিরক্ত বা খারাপ মুডে ছিলেন। অর্থাৎ, ক্ষুধা আর রাগের মাঝখানে আছে একটি মানসিক ধাপ। এই মানসিক ধাপটির নাম ইন্টারোসেপশন। নিজের শরীরের ভেতরে চলতে থাকা ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি কতটা স্পষ্টভাবে আমরা বুঝতে পারি।

মস্তিষ্কে ক্ষুধার সংকেত প্রথম ধরা পড়ে হাইপোথ্যালামাসে। এরপর ইনসুলা নামের একটি অংশ আমাদের জানায় “ক্ষুধা লেগেছে।” এই ইনসুলাই আবার আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও জড়িত। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ইন্টারোসেপশন ভালো, তারা ক্ষুধার্ত হলেও নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। তারা খিদে পায় ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ করে রেগে যায় না।

জটিলতা 

ক্ষুধাজনিত মেজাজ বদল শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়ে সম্পর্কের ওপর বাড়ি, অফিস, বন্ধুত্ব সব জায়গায়। এতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হয়। তখনই আমরা তাড়াহুড়ো করে চিপস, বার্গার বা মিষ্টিজাতীয় খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ি। দীর্ঘদিন শরীরের সংকেত উপেক্ষা করলে মানসিক চাপ বাড়ে, শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। 


শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। ছোট শিশুরা এখনো শরীরের সব সংকেত বুঝে উঠতে পারে না। খেলাধুলা বা আশপাশের উত্তেজনায় তারা ক্ষুধা টেরই পায় না। ফলাফল হঠাৎ কান্না, রাগ, জেদ। আসলে আধুনিক জীবনে বড়দের অবস্থাও অনেকটা একই। স্ক্রিন, কাজ আর ব্যস্ততার ভিড়ে আমরাও বুঝতে পারি না কখন শরীরের শক্তি ফুরিয়ে আসছে।

সমাধান: ক্ষুধা লাগলেও মেজাজ হারানো যাবে না। তবে এটা খুব বেশি সহজ না হলেও কিন্তু সমাধান আছে। বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হলো:  

নির্দিষ্ট সময় মেনে খাবার খাওয়া
শরীরের ক্ষুদ্র সংকেতগুলোর দিকে খেয়াল রাখা
নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা
এসব অভ্যাস শরীর ও মনের সংযোগকে আরও শক্ত করে। মনে রাখতে হবে, সব মুড খারাপের পেছনে অবশ্যই ক্ষুধা দায়ী নয়। কিন্তু একটু সচেতন হলেই অনেক অপ্রয়োজনীয় রাগ, বিরক্তি আর ভুল সিদ্ধান্ত এড়ানো সম্ভব। হয়তো পরেরবার রেগে যাওয়ার আগে একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনি আসলেই রেখে যাচ্ছেন নাকি ক্ষুধার কারণে এমন হচ্ছে।  

সূত্র: এনডিটিভি  

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..