সুদানে চলমান সংঘাতে যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের অনেকেই নীরবে অসহনীয় যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। যুদ্ধের বিভীষিকা তাদের পিছু ছাড়ছে না পালানোর পথেও। এমনই একজন মারিয়াম (ছদ্মনাম)। গত বছরের শুরুতে গেজিরা রাজ্য থেকে রাজধানী খার্তুমে যাওয়ার পথে তার গাড়ি থামিয়ে দেয় সশস্ত্র লোকজন। অন্য যাত্রীদের ছেড়ে দিয়ে কেবল তাকেই আলাদা করে নেয়া হয়।
মারিয়াম জানান, রাস্তার মাঝেই তাদের গাড়ি থামিয়ে নামতে বাধ্য করা হয়। তল্লাশির কথা বলে দু’জন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তাকে ডেকে নেয়। এরপর একটি ফাঁকা ঘরে নিয়ে গিয়ে মেঝেতে শুতে বলে এবং সেখানেই তাকে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর ভেঙে পড়া অবস্থায় তিনি গাড়িতে অপেক্ষমাণ পরিবারের কাছে ফিরে যান। তার খালা জানান, মারিয়াম সঙ্গে সঙ্গেই তাদের সব খুলে বলেন এবং তারা নিশ্চিত ছিলেন, হামলাকারীরা ছিল র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)–এর সদস্য।
মারিয়ামের অভিজ্ঞতা অনন্য নয়। দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশেরে একই ধরনের, আরও নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। মেডিকেল কলেজের ছাত্রী উম্মে কুলসুম (ছদ্মনাম) জানান, আরএসএফ সদস্যরা তাদের এলাকা ঘিরে ফেলে। তার চোখের সামনে তাকে লালন-পালন করা চাচাকে হত্যা করা হয়। এরপর তিনি, আরও তিন তরুণী এবং প্রতিবেশীর এক মেয়েকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়।
এই ব্যক্তিগত বর্ণনাগুলো মিলে যায় গত নভেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের সঙ্গে, যেখানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সুদানের ১৪টি রাজ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং পরিকল্পিত কৌশলের অংশ, যেখানে নারীদের ‘সম্পত্তি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উঠে আসে, কোনো এলাকা দখলের শুরুতেই বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশির সময় একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয়—‘এই বাড়িতে কি কোনো মেয়ে আছে? তরুণী আছে?’ অনেক সাক্ষী জানিয়েছেন, আরএসএফ সদস্যরা সরাসরি বলে, তারা ওই মেয়েকে নিতে এসেছে।
এই সহিংসতা কেবল তাৎক্ষণিক ধর্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়, অনেক নারীকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অপহরণ করে রাখা হচ্ছে। তাদের দিয়ে জোরপূর্বক শ্রম করানো হচ্ছে, কাপড় ধোয়া, রান্না করা এবং একইসঙ্গে যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হচ্ছে। আরও ভয়াবহভাবে, কিছু নারীকে সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী আফ্রিকার দেশগুলোতে নিয়ে গিয়ে দাস হিসেবে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
মানবাধিকার অনুসন্ধানী দলগুলোর মতে, এসব অপরাধ বিশেষভাবে মাসালিত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পূর্ব চাদে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় দেখা গেছে, মাসালিতরাই যৌন সহিংসতার প্রধান শিকার। তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার ‘শাস্তি’ হিসেবেই এ ধরনের সহিংসতা চালানো হচ্ছে। আইনের শাসন ভেঙে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। যেসব এলাকায় আরএসএফ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে কার্যকর কোনো বিচারব্যবস্থা নেই। ফলে অপরাধীরা সম্পূর্ণ দায়মুক্তির পরিবেশে এসব নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই সহিংসতার ভয়াবহ মাত্রা হাসপাতালগুলোতেও স্পষ্ট। ওমদুরমান ম্যাটারনিটি হাসপাতালের পরিচালক জানান, নথিভুক্ত ঘটনার চেয়েও বাস্তব সংখ্যা অনেক বেশি। তিনি বলেন, দুই বছরের কম বয়সী অন্তত ১৪ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে—যা বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নথিভুক্ত। হাসপাতালটিতে ১১ থেকে ২৩ বছর বয়সী অসংখ্য কিশোরী ও তরুণীকে আনা হয়েছে, যাদের অনেকেই ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিল। গর্ভাবস্থার মেয়াদ অনুযায়ী কারও গর্ভপাত, আবার কারও সন্তান প্রসব করাতে হয়েছে।
শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতাও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে দেশটিতে। চলতি বছরের শুরু থেকে শতাধিক শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সীরাও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আরএসএফ অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে তিন ধাপের একটি সহিংস প্যাটার্ন দেখা যায়—প্রথমে বাড়িতে ঢুকে লুটপাট ও ধর্ষণ, এরপর প্রকাশ্য স্থানে হামলা এবং শেষে দীর্ঘমেয়াদি আটক ও নির্যাতন।
এর মধ্যেই দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় কোটি কোটি মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে পড়ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু কূটনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও ভুক্তভোগীদের জন্য বাস্তব সহায়তা এখনো অপ্রতুল। অনেক নারী সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্কের ভয়ে পরিবারে ফিরতেও সাহস পাচ্ছেন না।
সূত্র: আল জাজিরা
এ জাতীয় আরো খবর..