ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। শীত তুলনামূলক কম সময় হলেও এ সময়ে অনেকের মধ্যেই দেখা যায়, শীত এলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে থাকে। অনেকের অভিযোগ, মোজা পরলেও পা ঠান্ডা থাকে, সোয়েটার গায়ে দিয়েও হাত জমে বরফ হয়ে যায়। বিশেষ করে ভোর কিংবা গভীর রাতে হাত-পা যেন বরফের মতো ঠান্ডা লাগে। কেউ এটাকে স্বাভাবিক শীতের প্রতিক্রিয়া ভেবে এড়িয়ে যান, আবার কেউ অস্বস্তিতে ভোগেন দীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু আপনি জানেন কি? সবসময় এই ঠান্ডা লাগা শুধু আবহাওয়ার কারণে হয় না?
এ বিষয়ে পুষ্টিবিদ তানিয়া ইহান বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে শীতে হাত-পা অতিরিক্ত ঠান্ডা হওয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে শরীরের ভেতরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, বিশেষ করে ভিটামিন ও পুষ্টির ঘাটতি। তিনি বলেন, শীতের দিনে হাত-পা ঠান্ডা কমাতে খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনতে পারেন। কারণ শীতের দিনে হাত-পা ঠান্ডা হলে সেটা সবসময় স্বাভাবিক ভাবা ঠিক না। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। যদি হাত-পা অতিরিক্ত ও দীর্ঘ সময় ধরে ঠান্ডা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, হাত-পা ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে ক্লান্তি, পেশি দুর্বলতা বা হালকা স্নায়ুবিক সমস্যা দেখা দেয়। এমন হলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। সাধারণত শীতকালে হাত-পা ঠান্ডা লাগা অনেক সময় স্বাভাবিক মনে হলেও, সেটিকে সবসময় অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ এটি শুধু আবহাওয়ার প্রভাব নয়, বরং শরীরের ভেতরের পুষ্টিগত ঘাটতি বা রক্তসঞ্চালনজনিত সমস্যারও ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, ফলেট, আয়রনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের অভাব শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে।
সে জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ গ্রহণ এবং জীবনযাপনে সামান্য সচেতনতা অনেক ক্ষেত্রেই এ সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। তবে শীতের মাঝেও যদি হাত-পা অতিরিক্ত ঠান্ডা থাকে এবং এর সঙ্গে ক্লান্তি, দুর্বলতা বা অন্য শারীরিক উপসর্গ যুক্ত হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ শরীরের ছোট সংকেতগুলোই অনেক সময় বড় রূপ ধারণ করে বড় সমস্যার আগাম বার্তা নিয়ে আসে।
শীতকালে শরীর নিজেকে বাঁচাতে একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চালু করে। এ সময় শরীর প্রথমে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্র উষ্ণ রাখতে চায়। ফলে হাত-পায়ের রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে যায় এবং সেখানে রক্ত প্রবাহ কমে যায়। ফলেই হাত-পা ঠান্ডা অনুভূত হয়।
আর এটি সাধারণত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু যদি মোজা, গ্লাভস বা গরম পোশাক পরার পরও হাত-পা অতিরিক্ত ঠান্ডা থাকে কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে এ সমস্যা চলতে থাকে, তাহলে সেটি শুধু শীতের প্রতিক্রিয়া নয়। তখন বিষয়টি শরীরের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা পুষ্টির ঘাটতির ইঙ্গিতও হতে পারে বলে মনে করেন এ পুষ্টিবিদ।
তিনি বলেন, সাধারণত ভিটামিন বি১২ এর অভাবে হাত-পা বেশি ঠান্ডা লাগে। ভিটামিন বি১২ রক্তের লোহিতকণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ভিটামিনের অভাবে শরীরে অক্সিজেন পরিবহন ঠিকভাবে হয় না। ফলে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দেয় এবং শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর অন্যতম লক্ষণ হলো— হাত-পা বরফ ঠান্ডা লাগা। এ জন্য ভিটামিন১২ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। যেমন— মাংস, সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, শাকসবজি ও ফল।
পুষ্টিবিদ তানিয়া ইহান বলেন, আর ফলেটও (ভিটামিন বি৯) রক্তকণা তৈরিতে সহায়তা করে। ফলেটের ঘাটতি হলে রক্তাল্পতা তৈরি হতে পারে এবং শরীর ঠান্ডার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। সে জন্য ফলেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। যেমন— পালংশাক, ডাল, শিম, লেবু, কমলা ইত্যাদি।
এ ছাড়া ভিটামিন ‘সি’ সরাসরি হাত-পা গরম করে না। তবে এটি আয়রন শোষণে অত্যন্ত কার্যকর। আয়রন ঠিকভাবে শোষিত হলে রক্তাল্পতার ঝুঁকি কমে এবং শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা উন্নত হয়। আয়রন দিয়ে তৈরি হয় হিমোগ্লোবিন, যা শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। আয়রনের অভাবে অক্সিজেন পরিবহন কমে যায়। ফলে শরীর ঠিকভাবে উষ্ণ থাকতে পারে না। আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতায় হাত-পা ঠান্ডা লাগা খুবই সাধারণ লক্ষণ। এ জন্য আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। যেমন— কলিজা, লাল মাংস, পালং শাক ও ডাল।
পুষ্টিবিদ তানিয়া ইহান আরও বলেন, স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের জন্য প্রাকৃতিক ইনসুলেশনের মতো কাজ করে, যা শরীরের ভেতরের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের নিচে একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, ফলে ঠান্ডার প্রভাব সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে না।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের হরমোন নিঃসরণ ও কোষের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখে, যা তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। বাদাম, অলিভ অয়েল, মাছ ও অ্যাভোকাডোর মতো খাবার নিয়মিত খেলে শীতকালে শরীর তুলনামূলক উষ্ণ থাকতে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..