ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতন, সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণহীন ঊর্ধ্বগতি দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র করে তুলেছে। প্রতিবাদে গত রোববার তেহরানে দোকানিরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা পঞ্চম দিন ওই বিক্ষোভ চলছে। তেহরান ছাড়া আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার তেহরানে শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নামেন।
ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইস্পাহান, ইয়াজদ ও জানজান শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে দেশটিতে এ বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
বুধবার তেহরানে ব্যবসায়ীদের এক ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানে এ অস্থিরতার পেছনে বিদেশি হস্তক্ষেপ থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে দেশের শত্রুরা বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগের প্রয়াস চালাচ্ছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের ভেতর থেকেও। সমন্বয় ও সহায়তার পরিবর্তে কখনো কখনো কিছু অবস্থান ও কর্মকাণ্ড দেশকে দুর্বল করে এবং ক্ষতি ডেকে আনে।’
ইরান সরকার বলেছে, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাদের উদ্বেগ শোনার জন্য একটি সংলাপের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল হুমকির সুরে বলেছেন, মুদ্রার দরপতন এবং দেশের অর্থনীতির সংকটময় পরিস্থিতির সুযোগে কেউ যদি দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, তবে তা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানির খরচ বেড়ে গেছে, এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়ে নাগরিকদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
রিয়ালের দ্রুত দরপতন: কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানি রিয়ালের দ্রুত দরপতন হচ্ছে। এর কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। গত রোববার বিক্ষোভ শুরুর সময় মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ছিল প্রায় ১৪ লাখ ২০ হাজার রিয়াল, এক বছর আগে যা প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার রিয়াল ছিল।
কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জাতিসংঘ দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলে চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। জাতিসংঘের এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দেশে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা: তেহরান থেকে আলজাজিরার সংবাদদাতা তোহিদ আসাদি বলেন, সরকার বিক্ষোভ নিয়ে বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অনেকের অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। গত সোমবারই তার সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে পরিবর্তন করার পদক্ষেপ নিয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিবেদক বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ‘উত্তেজনা বৃদ্ধির’ আশঙ্কা নিয়ে দেশের ভেতর গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারের ওপর জনগণের আস্থা তলানিতে: কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, সরকার দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট সমাধান করতে সক্ষম হবে—ইরানি জনগণের আর এমন বিশ্বাস নেই। আলজাজিরাকে ত্রিতা পারসি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট নিজেই প্রায় এক সপ্তাহ আগে প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি এসব সমস্যার সমাধানে কিছুই করতে পারছেন না।’
বহুমুখী চ্যালেঞ্জ: ইরানের অর্থনৈতিক সমস্যা গুরুতর, তবে এটাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। দেশটিতে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট চলছে, তেহরানসহ অন্যান্য বড় শহরের জন্য পানি সরবরাহকারী বেশিরভাগ বাঁধও তীব্র পানির সংকটে রয়েছে। সেগুলোয় পানির স্তর প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
এ জাতীয় আরো খবর..