জানাজার নীরবতা থেকে এক রাষ্ট্রনায়কের উত্থান

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৫-১২-৩১, | ২৩:৩৭:১৩ |
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ছিল কেবল একটি বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; সেটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নীরব কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। সেই মুহূর্তের কেন্দ্রে ছিলেন তার পুত্র, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মায়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি মাত্র দুইটি কথাই উচ্চারণ করেছেন—মায়ের ঋণ পরিশোধের দায়বদ্ধতা, এবং তার মায়ের কোনো ভুল-ত্রুটির জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। এর বাইরে কিছুই নয়।

কোনো আকাশভাঙা আহাজারি ছিল না, ছিল না প্রতিপক্ষের প্রতি গালি বা অভিশাপ, এমনকি যারা তার মাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে—তাদের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্য কোনো অভিযোগ নয়। নিজের মায়ের আকাশছোঁয়া রাজনৈতিক অর্জন নিয়েও একটি বাক্য ব্যয় করেননি তিনি। বরং অত্যন্ত সচেতনভাবে তিনি এই জানাজাকে সংকীর্ণ দলীয় ইভেন্টে পরিণত না করে এক সর্বজনীন জাতীয় শোকের পরিসরে রেখে দিয়েছেন। এই সংযম, এই নীরবতা—নিজেই এক শক্তিশালী ভাষা।

জানাজাকে কেন্দ্র করে তারেক রহমানের উপস্থিতি ও আচরণ—মলিন মুখে মায়ের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত, বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভারী বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান ও গ্রেসের কথা। এটি ছিল একজন “ট্রু স্টেটসম্যান”-এর মতো আচরণ। একই সঙ্গে ছিল মা-বাবা-ভাইহারা এক দুঃখী, বাস্তব মানুষের নীরব আর্তি।

জানাজা-পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের পরিবারের একটি ছবি আলাদা করে চোখে পড়ে। স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে তার উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল ‘ফ্যামিলিম্যান’ ইমেজের ইঙ্গিত দেয়। এ দেশে পরিবারকেন্দ্রিক রাষ্ট্রনায়কের উদাহরণ হাতে গোনা। একটি পরিবার হারানোর পরও আরেকটি পরিবারকে ঘিরে তিনি যেন ভবিষ্যতের জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকার নির্মাণ করছেন। পরিবারের সদস্যদের চেহারা-আচরণে যে সূক্ষ্ম ‘জিয়া ফ্যামিলি’ নুয়ান্স দেখা যায়, তা এ দেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

এই জানাজার মধ্য দিয়েই কার্যত দেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেন। আজ থেকে এমন অনেকেই তার প্রশংসা শুরু করবেন, যারা গত এক বছর ধরে তাকে নানাভাবে আক্রমণ করেছেন। আবার যারা আজ অন্যদের ‘বিএনপির দালাল’ আখ্যা দিচ্ছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে—নির্বাচনের পর এদের বড় একটি অংশই বিএনপির কাতারে ভিড়তে পারে। এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির নির্মম কিন্তু পরিচিত ব্যাকরণ।

স্পষ্ট বোঝা যায়, তারেক রহমান একটি ফ্রেশ স্টার্ট নিতে চাইছেন। এখন পর্যন্ত শত্রুদের প্রতি কোনো প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ তিনি দেখাননি। একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের জন্য এটি একটি অপরিহার্য গুণ। তার এই নতুন সূচনাকে স্বাগত জানানো যায়, তবে এটাও সত্য—এই পথ মোটেও মসৃণ নয়।

দেশের রাজনীতি ও সমাজ বর্তমানে এক জটিল, বহুস্তরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক ধরনের মিউটেশন ঘটছে—পুরনো গার্ডদের প্রভাব শিথিল হচ্ছে, আর নতুনরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা গড়ে তোলার স্বপ্নে বিভোর। তরুণ ও প্রবীণ সমাজ আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য, প্রোপাগান্ডা ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভ গ্রহণ ও নির্মাণে সক্ষম। এর ফলে একদিকে যেমন গভীরতর সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে জন্ম নিচ্ছে নতুন ধরনের উন্মাদনা ও অচেতনতা। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গ্রেস ও আভিজাত্যের চর্চা ক্রমেই ক্লিশে হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি সম্ভাবনাময়, কিন্তু একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত।

এই বাস্তবতায় সমাজে নতুন ধরনের ‘চেতনা’ ও হেজেমনি নির্মিত হচ্ছে—এবং তা আরও বাড়বে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, তারেক রহমানকে প্রোপাগান্ডার এক জটিল জালে বন্দি করার চেষ্টা তত তীব্র হবে। একসময়ের ভারতবিরোধী রাজনীতির আইকন তারেক রহমানকে তখন বলা হবে—তিনি ভারতের কাছে ‘জিম্মি’ বা ‘সোল্ড আউট’। এই প্রচারণা আসবে ভারতপন্থি ও ভারতবিরোধী—উভয় শিবির থেকেই। ধীরে ধীরে তাকে ঠেলে দেওয়া হবে আওয়ামী লীগের ন্যারেটিভের দিকে—ভারতপন্থি, এলিটপন্থী, ইসলামবিরোধী, উগ্র সেক্যুলার, বাঙালি জাতিবাদী।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ‘সিভিক ন্যাশনালিজম’ বা নাগরিক অধিকারভিত্তিক বাংলাদেশি জাতিবাদের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নাগরিকের অধিকার, নিরাপত্তা, মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিশোধের রাজনীতির বিরোধিতা—এসবই বিএনপির ঘোষিত অবস্থানের অংশ। সংস্কার প্রশ্নেও দলটির কিছু নিজস্ব চিন্তা আছে। তবে ‘ওল্ড গার্ড’-এর দল হওয়ার কারণেই এই অবস্থানগুলো বিএনপিকে আরও সহজে আওয়ামী লীগ ও ভারতের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চলবে।

তারেক রহমান এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে দেশে ফেরার পর থেকে, বিশেষ করে আজকের জানাজায় তার সামগ্রিক উপস্থিতি দেখে মনে হয়—বাবা ও মায়ের মধ্যপন্থি ও বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির লিগ্যাসি তিনি ধরে রাখার চেষ্টা করবেন, কিছু প্রাসঙ্গিক পরিবর্তনসহ। যদি তা সম্ভব হয়, তবে বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এ দফায় টিকে যাবে, এবং যারা নতুন করে দলের জায়গা নিতে চায়—তাদের হিসাব উল্টে যাবে।

আর যদি তা না হয়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। সেই বাস্তবতায় যেন আরেক ধরনের ‘সেক্যুলার/সোশাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্যাসিজম’ জন্ম না নেয়, কিংবা বিএনপি যেন আওয়ামী লীগের ভাগ্য বরণ না করে—সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আর এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে: পুরনো গার্ডের বাইরে একটি নতুন, ফ্রেশ ও গণতান্ত্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—যেটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে ভারসাম্য দিতে পারে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..

Dhaka Forecast & Prayer Schedule

--°C
Loading...
💧 Humidity
--%
🌬 Wind
-- km/h

3-Day Forecast

Prayer Time

🕌 Fajr 🕌 Dhuhr
-- --
🕌 Asr 🕌 Maghrib
-- --
🕌 Isha
--
Loading countdown…
দেশ ও মুদ্রা ১ ইউনিট = টাকা পরিবর্তন
⏳ Currency data loading...