যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন লাখো যাত্রী বিমানে ভ্রমণ করেন, তাদের সঙ্গে থাকে কোটি কোটি লাগেজ। প্রায় সব গন্তব্যে পৌঁছালেও অল্প একটি অংশ চিরতরে হারিয়ে যায়। সেই হারিয়ে যাওয়া লাগেজকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে একটি ব্যতিক্রমী সার্কুলার ইকোনমি—যার কেন্দ্র আলাবামা অঙ্গরাজ্যের ছোট শহর স্কটসবোরো।
‘আনক্লেইমড ব্যাগেজ’ নামের এ প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র হারানো লাগেজ বিক্রয়কেন্দ্র, যেখানে বিয়ের পোশাক থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় বর্ম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় সব এয়ারলাইনের সঙ্গে আনক্লেইমড ব্যাগেজের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। কোনো লাগেজ ৯১ দিনেও দাবিদার না পেলে, যাত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পর এয়ারলাইন সেই লাগেজের মালিকানা প্রতিষ্ঠানটির কাছে হস্তান্তর করে। এরপর সেগুলোর ভেতরের জিনিসপত্র বাছাই, মূল্যায়ন ও পুনর্বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানটির ৫০ হাজার বর্গফুটের বিক্রয় ফ্লোরে যুক্ত হয় ৭ হাজারের বেশি ‘নতুন’ পণ্য। বিক্রির উপযোগী জিনিসগুলো খুচরা বাজারমূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ কম দামে বিক্রি করা হয়। বিক্রির অনুপযোগী পণ্যের একটি বড় অংশ দাতব্য সংস্থায় দেয়া হয়, আর বাকিগুলো রিসাইকেল করা হয়।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫০ কোটি লাগেজ ফ্লাইটে চেক-ইন করা হয়েছে। ক্যারি-অন ব্যাগের সংখ্যা ছিল প্রায় ২১০ কোটি। এয়ারলাইনের বাইরে বাস, ট্রেন, কার্গো কোম্পানি, হোটেল ও ভাড়া গাড়ি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও আনক্লেইমড ব্যাগেজের চুক্তি রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে আসা লাগেজের পরিমাণ অনেক বড়।
তবে আনক্লেইমড ব্যাগেজকে কোনোভাবেই থ্রিফট স্টোর বলা যায় না। কারণ এখানে প্যাটাগোনিয়া, বারবেরি, রোলেক্স, অ্যাপল, কার্টিয়ার, লুই ভিতো, গুচ্চি ও বুলগারির মতো ব্র্যান্ডের পণ্য পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেনিফার ক্রিটনার বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো যা আসে, তার সর্বোচ্চ মূল্য তৈরি করা। কিছু পণ্য বিক্রি হয়, কিছু দান করা হয়, কিছু রিসাইকেল হয়। সব কিছুরই একটি দ্বিতীয় জীবন থাকে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, লাগেজের ভেতর থাকা প্রতিটি পণ্য পরিষ্কার, যাচাই, গবেষণা ও প্রমাণীকরণ করা হয়। নকল পণ্য বিক্রি করা হয় না। এখানে মাসে প্রায় এক লাখ পোশাক ধোয়া হয়, যা আলাবামা অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক লন্ড্রি কার্যক্রমগুলোর একটি।
আনক্লেইমড ব্যাগেজের যাত্রা শুরু ১৯৭০ সালে। ডয়েল ওউয়েন্স নামের এক উদ্যোক্তা ৩০০ ডলার ধার করে একটি ট্রাকে করে ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ১১০টি হারানো ব্যাগ কিনে আনেন। সেগুলো বিক্রি করেই গড়ে ওঠে এ ব্যবসা। ১৯৯৫ সালে তিনি ব্যবসার দায়িত্ব দেন তার ছেলে ব্রায়ান ওউয়েন্সের হাতে। একই বছর মার্কিন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব অপরাহ উইনফ্রে তার অনুষ্ঠানে আনক্লেইমড ব্যাগেজকে ‘সেরা কেনাকাটার গোপন ঠিকানা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এ দোকান।
বর্তমানে বছরে ১০ লাখের বেশি মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। আলাবামা পর্যটন বিভাগ প্রতিষ্ঠানটিকে রাজ্যের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ২০২৩ সালে চালু করা হয়েছে আনক্লেইমড ব্যাগেজ মিউজিয়াম। সেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে মাইকেল জর্ডানের স্বাক্ষরিত বাস্কেটবল, ৩ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো মিশরীয় সমাধি মুখোশ, মধ্যযুগীয় বর্মেল মতো মূল্যবান পণ্য। একসময় একটি মোজার ভেতর পাওয়া গিয়েছিল ৪০ ক্যারেটের পান্না, যা বিক্রি হয়েছিল ১৪ হাজার ডলারে।
বিবিসি অবলম্বনে
এ জাতীয় আরো খবর..