ইউরোপের ব্যাংকগুলো বর্তমানে এমন একটি নতুন বিনিয়োগ প্রবণতার দিকে এগোচ্ছে যা আগের থেকে অনেক ভিন্ন। আগে ব্যাংকগুলো সাধারণত স্টার্ট-আপ বা ছোট কোম্পানিতে বিনিয়োগ করত, অথবা প্রাইভেট ইক্যুইটি ফান্ডকে ঋণ দিত। অর্থাৎ তারা মূলত ঝুঁকিপূর্ণ ও বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যবসার দিকে মনোযোগ দিত। তবে এখন তারা প্রাইভেট ইক্যুইটির হাতে গড়া বড়, পরীক্ষিত ও লাভজনক কোম্পানিগুলো সরাসরি কিনে নিচ্ছে। এটি বিনিয়োগের একটি নতুন রূপ, যা মূলত Merger & Acquisition-এর সাথে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রাইভেট ইক্যুইটি আসলে কি? আসুন সহজে বুঝিয়ে বলি। ধরুন, আপনি ৫ বছর আগে একটি দোকান কিনেছিলেন। দোকানটা বেশ ভালো চলেছে বিগত বছরগুলোতে। কিন্তু বর্তমানে বাজার খারাপ, নতুন ক্রেতা নেই। হঠাৎ পাশের বড় ব্যবসায়ী (প্রাইভেট ইক্যুইটি টাইপ যিনি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী) এসে বলল, “দোকানটা আমি কিনে নিচ্ছি। খুব বেশি লাভ না হলেও তোমার পুঁজি উঠে যাবে।”
- আপনি স্বস্তি পেলেন।
- আবার ব্যবসায়ীও একটি চালু বা ভাল দোকান পেল।
ফাইন্যান্সে এটা একটি পরিচিত phrase আছে, যার ভাবার্থ হল: এমনভাবে কাজটা করা যাতে বিক্রেতার বড় ক্ষতি না হয়, বাজারে আতঙ্ক না ছড়ায়, বা যিনি কিনছেন তার দাম খুব বেশি পড়ে না যায়। ইউরোপে আগে সাধারণত প্রাইভেট ইক্যুইটি ফান্ড কোনো মাঝারি আকারের কোম্পানি কেনার পর তারা ৫-৭ বছর ধরে কোম্পানিটির পরিচালনায় থাকতো, তারপর সুবিধাজনক সময়ে ভালো দামে বিক্রি করতে। ওই কোম্পানি বিক্রি করা হতো অন্য কোনো প্রাইভেট ইক্যুইটি ফান্ডকে, শেয়ারবাজারে (IPO) বা বড় কোনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানিকে। কিন্তু এখন এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক নিজেই ক্রেতা হয়ে যাচ্ছে। এতে করে প্রাইভেট ইক্যুইটি ফান্ডগুলো কোন বড় লোকসান বা চাপ ছাড়াই নিজেদের কোম্পানি বিক্রি করতে পারছে এবং ব্যাংকগুলো একটি স্থিতিশীল ও পরীক্ষিত ব্যবসা অর্জন করছে।
ব্যাংকিং জগতের প্রেক্ষাপটে, আরেকটি উদাহরণ দেই:
ধরুন একটি প্রাইভেট ইক্যুইটি ফান্ডের কাছে একটি পেমেন্ট/কার্ড প্রসেসিং কোম্পানি, সফটওয়্যার ফার্ম বা ফিনটেক কোম্পানি আছে। বর্তমানে বাজার এখন একটু মন্দা, সুদের হার বেশি, IPO করা কঠিন। যার কারণে, প্রাইভেট ইক্যুইটি ফান্ড চিন্তায় আছে। তখন ব্যাংক এসে বলল, "ঠিক আছে, তোমরা আমাকে বিক্রি করো। দাম খুব খারাপ দেব না, আবার খুব বেশিও দিতে পারবো না"। আবার ব্যাংক দেখে এই কোম্পানিটা কিনলে আমার ডিজিটাল ব্যাংকিং শক্তিশালী হবে। তখন ব্যাংক সরাসরি কোম্পানিটা কিনে নেয়। যেটা আসলে এক ধরনের Merger & Acquisition (M&A) হচ্ছে। এই নতুন পদ্ধতিতে প্রাইভেট ইক্যুইটির ভূমিকা কমে যাচ্ছে না বরং পরিবর্তন হচ্ছে। তারা এখন আরো কোম্পানি কিনবে, বড় করবে এবং তাদের মাথায় থাকবে যে ভবিষ্যতে কোন ব্যাংক বা বড় সংস্থা কোম্পানিটি কিনতে আগ্রহী কি না। ফলে উচ্চ ঝুঁকির, অতিরিক্ত ঋণপ্রবণ ডিলের চাহিদা কমতে পারে, কারণ ব্যাংকরা মূলত স্টেবল ক্যাশ-ফ্লো ও রেগুলেটরি-ফ্রেন্ডলি ব্যবসা খুঁজছে।
ইউরোপে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তখনই যখন ডিজিটাল ব্যাংকগুলো যেমন মনজো, রেভোলাত যুক্তরাজ্যে গ্রাহক সন্তুষ্টি জরিপে এইচএসবিসি বা বার্কলেস ব্যাংক গুলোর মতো বড় ব্যাংকগুলোকে পেছনে ফেলে শীর্ষে এসেছে। যদিও এই ডিজিটাল ব্যাংকগুলো বড় ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকের চাইতে অনেক ছোট, তবে তারা গ্রাহক সন্তুষ্টি এবং দ্রুত সেবা প্রদানে তাদেরকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপট ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে পুরোনো বাজারে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি আর যথেষ্ট নয়। ফলে তারা এখন নতুন অঞ্চলে যেমন MENA (Middle East & North Africa) বা অন্য উচ্চ-বৃদ্ধির বাজারে M&A-এর মাধ্যমে দ্রুত সম্প্রসারণ করার চিন্তাভাবনা করছে।
MENA অঞ্চলটি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ডিজিটাল ফাইন্যান্স এবং ব্যাংকিং সেবায়। অনেক দেশই এখানে ক্লাউড, মোবাইল ব্যাংকিং, ফিনটেক স্টার্ট-আপ ও ডিজিটাল পেমেন্টে বিনিয়োগ করছে। এছাড়া এই অঞ্চলে জনসংখ্যা তরুণ এবং প্রযুক্তি গ্রহণযোগ্য, ফলে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা দ্রুত গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারছে। এই জন্য এইচএসবিসি বা বার্কলেস ভাবছে, প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানি ক্রয় করে (M&A-এর মাধ্যমে) তারা দ্রুত বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। নতুন দেশে শাখা খোলার চেয়ে এই পথ বেশি কার্যকর ও দ্রুত হবে। MENA অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে ব্যাংকগুলো গ্রাহক বেস বাড়াতে, নতুন প্রোডাক্ট চালু করতে ও আঞ্চলিক ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
এ জাতীয় আরো খবর..