✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৫-১২-২০, | ১৭:০৫:১০ |অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় র্যালি গাড়িচালক মলি অ্যানে টেইলর জন্মগ্রহণ করেন ৬ মে ১৯৮৮ সালে সিডনিতে। ছোটবেলায় থেকেই তার জীবনে গাড়ি আর গতির প্রতি আলাদা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। এর একটি বিশেষ কারণ হচ্ছে তার পরিবার। বাবা-মা দুজনই মোটর রেসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। মা করাল টেইলর ছিলেন চারবারের জাতীয় র্যালি সহচালক চ্যাম্পিয়ন, বাবা মার্ক টেইলরও দীর্ঘদিন ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ছোটবেলায়ই গাড়ি, রাস্তাঘাট, প্রতিযোগিতা—এসব ছিল তার জীবনের স্বাভাবিক পরিবেশ।
শৈশবে মলি ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কারও জিতেছিলেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গতির প্রতি তার আকর্ষণ আরও প্রবল হয়। এক সময় তিনি নিজের প্রিয় ঘোড়াটি বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে প্রথম র্যালি গাড়িটি কেনেন। তার কথায়, ‘একটি ঘোড়ার বদলে শতগুণ শক্তি পাওয়ার লোভেই র্যালিতে আসা।’
তিনি নিউ সাউথ ওয়েলসের একটি মেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিষয়ে ভর্তি হলেও র্যালির প্রতি বিশাল টান তাকে পড়াশোনার বাইরে টেনে আনে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের আসল পথ হবে গাড়ি চালনার জগতে সাফল্য খোঁজা।
র্যালি জগতে প্রবেশ
মলি প্রথম গাড়ি চালনার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেন তার বাবার পরিচালিত র্যালি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেখান থেকেই তিনি সুরক্ষিতভাবে উচ্চগতির গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখেন। এর পর স্থানীয় ছোট প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এ সাফল্য তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগায়।
২০০৬ সাল তার জীবনে বড় মোড় আনে। সে বছর তিনি দেশের মোটর ক্রীড়া ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক প্রতিভা বাছাই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হন। এমন কর্মসূচিতে প্রথমবারের মতো কোনো তরুণী সুযোগ পান। একই বছর তিনি নিউ সাউথ ওয়েলস র্যালি প্রতিযোগিতায় দুটি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন। এ অর্জনের জন্য পান ‘বর্ষসেরা তরুণ প্রতিভা’ সম্মাননা।
পরবর্তী দুই বছর জাতীয় র্যালির একই বিভাগের চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রমাণ করেন যে তার প্রতিভা স্থায়ী ও ক্রমবর্ধমান। কেবল জাতীয় পর্যায়েই নয়, তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার মতো সক্ষমতা রাখেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য
২০০৯ ও ২০১০ সালে তিনি ব্রিটেনে নারী র্যালি চালকদের জাতীয় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন। এতে তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ে। পরের বছর তিনি বিশ্ব র্যালি একাডেমিতে তরুণ প্রতিভা হিসেবে নির্বাচিত হন। এখানে তিনি ছিলেন একমাত্র নারী প্রতিযোগী।
২০১৩ সালে তিনি ইউরোপের নারী বিভাগে র্যালি চ্যাম্পিয়ন হন। ইউরোপের জটিল, বরফঢাকা বা পাথুরে পথে র্যালি চালানোর অভিজ্ঞতা তাকে করে তোলে আরও দক্ষ, আরও পেশাদার।
নিজ দেশে ফেরা ও ঐতিহাসিক অর্জন
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার পর মলি আবার দেশে ফিরে অংশ নেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় র্যালি প্রতিযোগিতায়। ২০১৬ সাল তাকে এনে দেয় জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি প্রথম নারী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় র্যালি চ্যাম্পিয়ন খেতাব জেতেন। একই সঙ্গে দেশের সর্বকনিষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ডও গড়েন। এ অর্জনের জন্য তিনি পান অস্ট্রেলিয়ার মোটর ক্রীড়ার অন্যতম সম্মাননা—‘পিটার ব্রোক স্মৃতি পদক’। এই জয় প্রমাণ করে, র্যালি কেবল পুরুষের খেলা নয়—দক্ষতা, সাহস ও মনোযোগ থাকলে নারীও সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারে।
পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব
মলি শুধু প্রচলিত র্যালিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বৈদ্যুতিক গাড়িভিত্তিক নতুন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। বিশ্বে পরিবেশবান্ধব র্যালি প্রতিযোগিতা চালুর পর মলি প্রথম দিকের তারকার একজন হয়ে ওঠেন। ২০২১ সালে তিনি তার দলসহ বৈদ্যুতিক র্যালি সিরিজে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হন। পরে আরও বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শিরোপা জিতে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ রাখেন।
বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যতের লক্ষ্য
বর্তমানে মলি টেইলর আন্তর্জাতিক বৈদ্যুতিক র্যালি প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন, পাশাপাশি তরুণদের মোটর ক্রীড়ার প্রতি উৎসাহিত করতে নানা কর্মসূচিতে যুক্ত আছেন। একই সঙ্গে নারী চালকদের পথ সুগম করার জন্যও তিনি কাজ করে চলেছেন।
ভবিষ্যতে তিনি র্যালি প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব গাড়ি নিয়ে কাজ করতে চান বলে জানিয়েছেন। তার মতে, ভবিষ্যতের র্যালি হবে সাশ্রয়ী, কার্বন নিঃসরণহীন ও প্রযুক্তিনির্ভর। আর সেই রূপান্তরের অংশ হতে চান তিনি নিজেই।