উদারতা: নববি চরিত্রের সার্বজনীন বার্তা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৫-১২-১৭, | ০৬:১১:২১ |

উদারতা হলো মানুষের এমন এক মহান মানবিক গুণ, যেখানে ব্যক্তি নিজের স্বার্থের চেয়ে অন্যের কল্যাণকে বেশি মূল্য দেয়। উদারতা মানে শুধু দান-খয়রাত নয়; এর গভীর অর্থ হলো কথা, আচরণ ও চিন্তায় সহনশীল হওয়া, ক্ষমাশীল হওয়া এবং পরোপকারী মনোভাব ধারণ করা।

 

সহজভাবে বললে, উদারতা এমন এক মন-মানসিকতা, যেখানে নিজের হৃদয়ের দরজা খোলা রেখে মানুষকে ভালোবাসা, বোঝা, সাহায্য করা এবং ক্ষমা করা হয়। উদারতা উত্তম চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নববি শিক্ষায় মানুষকে বিচার করা হয় তার আচরণ ও হৃদয়ের প্রশস্ততা দিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

 إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاَقًا

‘তোমাদের মধ্যে যার স্বভাব-চরিত্র ভাল সেই তোমাদের মধ্যে সব চাইতে উত্তম।’ (বুখারি ৫৬০৯)

উদারতা মানুষের চরিত্রকে যে উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, সেখানে ধন-সম্পদ, প্রতিপত্তি বা ক্ষমতা পৌঁছাতে পারে না—পারে শুধু হৃদয়ের বিশুদ্ধতা। কারণ উদারতা কোনো প্রদর্শন নয়; এটি মানুষের অন্তরের এমন এক আলোক, যা কথা, কাজ ও চিন্তা—এই তিন ক্ষেত্রেই সহনশীলতার এক বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটায়। উদারতার অন্যতম রূপ হলো ক্ষমা। নববি চরিত্র আমাদের শেখায়—ক্ষমা দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلاَّ عِزًّا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلاَّ رَفَعَهُ اللَّهُ

‘যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা উঁচুতে তুলে দেন।’ (মুসলিম ৬৩৫৬)

 

সত্যিকারের উদার মানুষ কখনো ক্ষুদ্রতার পথ বেছে নেয় না। তারা মানুষের ভুল ক্ষমা করে, দুঃখে সঙ্গ দেয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং নিজের স্বার্থের আগে অন্যের কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়। উদারতার সবচেয়ে বড় মহত্ত্ব হলো—এটি মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে শেখায়।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) উদারতার সর্বোচ্চ প্রতিমূর্তি। তিনি মুসলিম-অমুসলিম, ধনী-গরিব, বন্ধু-শত্রু—সবার প্রতি এমন সহানুভূতি ও সহনশীলতা প্রদর্শন করেছেন, যা মানবতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তার চরিত্রে আমরা উদারতার সেই সত্য রূপ দেখতে পাই, যা কোনো ধর্ম বা জাতির সীমানায় আবদ্ধ নয়; বরং সার্বজনীন। নববি উদারতা কোনো ধর্ম বা জাতির গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়—এটি সর্বজনীন মানবিক আহ্বান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

 الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ ارْحَمُوا مَنْ فِي الأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ الرَّحِمُ شُجْنَةٌ مِنَ الرَّحْمَنِ فَمَنْ وَصَلَهَا وَصَلَهُ اللَّهُ وَمَنْ قَطَعَهَا قَطَعَهُ اللَّهُ

‘রহমশীলদের প্রতি রহমানও রহম করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি রহম করবে তাহলে আকাশবাসী তোমাদের উপর রহম করবেন। রেহেম হল রাহমান শব্দ থেকে উদগত। যে ব্যাক্তি রেহেমের বন্ধন মিলাবে আল্লাহ তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন আর যে ব্যাক্তি রেহেমের বন্ধন ছিন্ন করবে আল্লাহও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন।’ (তিরমিজি ১৯৩০)

তার সাহাবিগণও ছিলেন উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তারা যুদ্ধক্ষেত্রেও শত্রুর প্রতি মানবিকতা দেখিয়েছেন, অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সম্পদ দান করেছেন এবং ক্ষমা করে প্রমাণ করেছেন— উদারতা শুধু একটি গুণ নয়; এটি একজন বিশ্বাসীর জীবনের মূলমন্ত্র।

উদারতা মানুষকে শুধু শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই এনে দেয় না; এটি মানুষের অন্তরকে করে প্রশান্ত, সম্পর্ককে করে দৃঢ় এবং সমাজকে করে আরও শান্তিময়। উদারতার আলো যখন কোনো হৃদয়ে জ্বলে ওঠে, তখন সেই হৃদয় অন্যকে আলো দিতে বাধ্য হয়— যেমন একটি প্রদীপ নিজেকে জ্বালিয়ে চারপাশ আলোকিত করে।

উদারতার মূল দিকগুলো—

১. সহনশীলতা: ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তা ও ভিন্ন মানুষের প্রতি ধৈর্যশীল হওয়া।

২. ক্ষমাশীলতা: মানুষের ভুল ক্ষমা করতে জানা।

৩. পরোপকার: সুযোগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যকে সাহায্য করা।

৪. মহত্ত্ব: ছোট বিষয়কে বড় করে না দেখা, সংকীর্ণতা থেকে দূরে থাকা।

৫. মানবিকতা: মানুষকে শ্রদ্ধা করা এবং বিনয়ের সঙ্গে আচরণ করা।

এই পৃথিবী যত জটিলই হোক না কেন, উদার মানুষরাই সবসময় পৃথিবীকে কিছুটা হলেও সুন্দর করে তোলে। তাই উদারতা শুধু একটি মানবিক গুণ নয়— এটি মানবতার প্রতি মানুষের চূড়ান্ত দায়িত্ব এবং মহত্তম পরিচয়।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..

Dhaka Forecast & Prayer Schedule

--°C
Loading...
💧 Humidity
--%
🌬 Wind
-- km/h

3-Day Forecast

Prayer Time

🕌 Fajr 🕌 Dhuhr
-- --
🕌 Asr 🕌 Maghrib
-- --
🕌 Isha
--
Loading countdown…
দেশ ও মুদ্রা ১ ইউনিট = টাকা পরিবর্তন
⏳ Currency data loading...