ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধস: মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ২০

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-০৯, | ১০:৫১:৫১ |
কক্সবাজারে টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণের ফলে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলার বিভিন্ন পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবন এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো, যেখানে পাহাড়ধস ও দেয়াল ধসের একাধিক ঘটনায় অন্তত ১৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। একই সময়ে কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও পেকুয়াসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে পৃথক পাহাড়ধসে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ জনে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর এ-৭/৩ ব্লকে অবস্থিত খদিজাতুল কোবরা নুরানী ও হেফজখানায়। টানা বৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়া একটি পাহাড়ের ঢাল ধসে মাদরাসার ওপর পড়ে। এতে মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় বহু শিক্ষার্থী।

দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন সদস্য, ক্যাম্প কো-অর্ডিনেশন অ্যান্ড ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট (CCCM)-এর স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় রোহিঙ্গা বাসিন্দা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। আহত পাঁচ শিশুকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, উদ্ধার হওয়া ১৩ শিশুর মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মানবিক সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা জানান, দুর্ঘটনার সময় মাদরাসাটিতে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিল। পাহাড়ধসের পর উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করেন। স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হলেও ভারী বৃষ্টি ও কাদামাটির কারণে কাজ ব্যাহত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদেক জানান, মেয়েদের মাদরাসাটির ঠিক ওপরে একটি মক্তব ছিল। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ের ঢাল ধসে ভবনটির ওপর পড়ে। এতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো এলাকা ধুলা ও কাদায় ঢেকে যায় এবং ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা চাপা পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর প্রায় ২টা ১০ মিনিটে ক্যাম্প-৫-এর মেইন ব্লকের এ/৩ উপ-ব্লকে অবস্থিত খদিজাতুল কোবরা নুরানী মহিলা মাদরাসা ও হেফজখানার ওপরে থাকা প্রায় ১২ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর নির্মিত একটি মক্তব ও মসজিদের দেয়াল ধসে নিচের হেফজখানার একাংশের ওপর পড়ে। সে সময় হেফজখানায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্রী কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করছিল। আকস্মিক এ দুর্ঘটনায় বহু ছাত্রী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।

ঘটনার খবর পেয়ে ইরানী পাহাড় পুলিশ ক্যাম্পের টহল দল, অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য, এপিবিএন, ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ক্যাম্প-৫-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন এবং নিহতদের দাফনের অনুমতি দেন।

প্রাথমিকভাবে নিহতদের মধ্যে শাহিদা (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২), ওমাইচা বিবি (১৩) এবং রাশিদা (১৬)-এর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে রয়েছে আসরা (৯), বেগম জান (১৫), ফারেসা বিবি (১২), জান্নাত আরা বিবি (৮), নূর ফাতেমা (১০), নুর সেহেরা (১২), আব্দুল মোনাফ (১৭) এবং নূর কায়েস (১০)। তাদের কয়েকজন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল, জিকে হাসপাতাল এবং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) রাতে উখিয়ার তিনটি পৃথক রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড়ধসে নিহত হন মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। একই রাতে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ি ঢলে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরেকটি পাহাড়ধসে উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩) নিহত হন। নতুন এই দুর্ঘটনার পর গত কয়েকদিনে শুধুমাত্র উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেই পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা ১৬ জনে পৌঁছেছে।

রোহিঙ্গা মাঝি দিল মোহাম্মদ জানান, উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যান। তার আশঙ্কা, হিফজখানার ভেতরে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন। উদ্ধারকারীরা সম্ভাব্য সব স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।

ক্যাম্প-১৪-এর অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমীন বলেন, পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এদিকে একই সময়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার সাত্তারঘোনা, দরিয়ানগর, উখিয়া এবং পেকুয়ায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় টানা বর্ষণের কারণে বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হানান জানান, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত জেলায় ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সমুদ্রবন্দরসমূহে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন প্রতিকূল থাকতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তার মতে, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার সব সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য একটি কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সহায়তার জন্য ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা দুর্যোগ ও ত্রাণ কর্মকর্তাসহ একাধিক টিম মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছে।

টানা বর্ষণের কারণে কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষ, বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বসবাসরত শরণার্থীরা এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। দুর্বল পাহাড়, অপরিকল্পিত বসতি এবং অব্যাহত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রশাসন, উদ্ধারকারী সংস্থা এবং মানবিক সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..