আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে পৃথিবী যেন একটি ছোট্ট স্ক্রিনে বন্দি। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে অসীম এক ভার্চুয়াল জগত্। এক ক্লিকে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। যোগাযোগ সহজ হয়েছে, জ্ঞান অর্জনের পথ বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির ঝলমলে আলোর আড়ালে নীরবে জন্ম নিচ্ছে এক ভয়াবহ অন্ধকার অধ্যায়ের, যা মূলত নৈতিকতা ও লজ্জাশীলতার অপমৃত্যু।
তথাকথিত আধুনিকার যুগে বেহায়াপনা আর লজ্জার বিষয় নয়; বরং অনেকের কাছে এটি প্রগতি, আধুনিকতা, এমনকি নিজেকে বিকশিত করার নাম। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানুষ পাপ করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে, যেখানে গুনাহকে আর গুনাহ বলেও মনে হচ্ছে না।
ইসলাম লজ্জাশীলতাকে কেবল একটি নৈতিক গুণ হিসেবে শেখায়নি; বরং এটিকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা। (মুসলিম, হাদিস:৩৫)
আরেক হাদিসে তিনি বলেন, প্রত্যেক দ্বীনের একটি স্বতন্ত্র চরিত্র আছে; ইসলামের চরিত্র হলো লজ্জাশীলতা। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৮১)
লজ্জাশীলতার উপকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, লজ্জাশীলতা সর্বদা কল্যাণ বয়ে আনে। (বুখারি, হাদিস:৬১১৭)
এই হাদিসগুলো আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়, যেখানে লজ্জাশীলতা দুর্বল হয়, সেখানে ঈমানও দুর্বল হতে শুরু করে।
লজ্জাশীলতা মানুষের অন্তরের এমন এক আলোকবর্তিকা, যা তাকে ঈমান, পবিত্রতা ও সততার পথে পরিচালিত করে। এটি বিবেকের নীরব প্রহরী, যার উপস্থিতিতে মানুষ পাপের দ্বারপ্রান্তে এসেও ফিরে দাঁড়ায়। তাই যার হূদয়ে হায়ার দীপ্তি যত উজ্জ্বল, অন্যায় ও অশ্লীলতার প্রতি তার সংকোচ তত গভীর। কিন্তু যখন হায়া চলে যায়, তখন আর কোনো বাঁধ অবশিষ্ট থাকে না। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তোমার লজ্জা থাকবে না, তখন যা ইচ্ছা তাই করবে। (বুখারি, হাদিস:৬১২০)
আজকের ডিজিটাল সমাজ যেন এই হাদিসের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। মুসলিম সমাজের ঘর থেকে ঘরে এটি পাপের সুনামি বইয়ে দিচ্ছে। কারণ ভার্চুয়াল জগতের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এখানে মানুষ নিজেকে অদৃশ্য ভাবতে শুরু করে। মনে হয়, ‘আমি তো একা’, ‘কেউ তো দেখছে না’, ‘এটা তো শুধু অনলাইন।’ কিন্তু একজন মুমিনের জন্য এই ভাবনা কত বড় আত্মপ্রবঞ্চনা!
অথচ আল্লাহ সবকিছু দেখেন। তাঁর নজর এড়িয়ে কোনো কিছু করাই সম্ভব নয়। আমাদের দুই কাঁধে নিয়োজিত ফেরেশতারা আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডই লিখে রাখেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, চোখের খেয়ানত এবং অন্তরের গোপন বিষয়ও তিনি জানেন। (সুরা গাফির, আয়াত:১৯)
স্ক্রিনের সামনে বসে মানুষ কী দেখছে, কোন ছবিতে দৃষ্টি থামছে, কার সঙ্গে কী কথোপকথন চলছে— সবই ডাটাবেইজে থেকে যায়। এআই অ্যালগরিদম, তার প্রতিটি গতিবিধি অনুসরণ করে তার মানসিকতা ও চাহিদা সম্পর্কে জেনে রাখে—যাতে তাকে সে হিসেবে বিজ্ঞাপন দেখানো যায়। সেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র অধিপতি প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছেতো সবকিছু আরো বেশি স্পষ্ট। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় লজ্জাশীলতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তিন জায়গায় চোখে, কথায় এবং আঙুলে।
চোখ হারামের দিকে ছুটে যায়, কথা শালীনতা হারায়, আঙুল এমন বার্তা লিখে ফেলে, যা মুখে উচ্চারণ করা লজ্জাজনক ছিল। আল্লাহ বলেন, মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে। (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)
বর্তমান যুগে এই আয়াত শুধু রাস্তা বা বাজারের জন্য প্রযোজ্য নয়; বরং মোবাইল স্ক্রিন, ভিডিও ফিড এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি স্ক্রলের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। মানুষের অন্তরকে হেদায়েতের আলোয় আলোকিত রাখতে হলে তাকে সব ধরনের গুনাহ থেকে পবিত্র রাখতে হবে। মানুষের যেসব অঙ্গের মাধ্যমে তার ঈমান-আমল ও অন্তর কলুসিত হয়, সব অঙ্গের ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। যার অন্যতম মাধ্যম হলো, লজ্জাশীলতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পর্দাকারী; তিনি লজ্জাশীলতা ও পর্দা ভালোবাসেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০১২)
যে আল্লাহ লজ্জাশীলকে ভালোবাসেন, তাঁর বান্দা কীভাবে নির্লজ্জতাকে নিজের পরিচয় বানায়?
আমাদের স্মরণ রাখা উচিত, ভার্চুয়াল জগতে করা প্রতিটি কাজ রেকর্ড হচ্ছে। শুধু প্রযুক্তির ডাটাবেইজে নয়, আমলনামায়ও। আল্লাহ বলেন, মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য প্রহরী প্রস্তুত রয়েছে। (সুরা কাফ, আয়াত: ১৮)
আজ যে কমেন্ট লিখছেন, যে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, যে ভিডিও দেখছেন, কিয়ামতের দিন সেগুলোই আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারে।
ভার্চুয়াল জগত্ ক্ষণস্থায়ী। যা কিছু এক সময়ের ট্রেন্ড, তা এক সময় হারিয়ে যায়। আজকের ভাইরাল পোস্ট আগামীকাল বিস্মৃত হয়। কিন্তু গুনাহের দাগ হূদয়ে থেকে যায়, আমলনামায় থেকে যায়, যতক্ষণ না বান্দা সত্যিকারের তওবা করে।
ভাচুয়াল যুগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে মানুষ নিজের অজান্তেই অনেক জঘন্য কাজের অংশীদার হয়ে যায়, যার পরিণাম ভয়াবহ। যেমন, এখানে মানুষ মজার ছলে এমন অনেক কিছু শেয়ার করে বসে, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর বা পরোক্ষভাবে অশ্লীলতার প্রচার। অথচ বিনোদনের নামেও অশ্লীলতা প্রচার করার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সুরা আন-নুর, আয়াত: ১৯)
লজ্জাশীলতা রক্ষা করা এখন আর শুধু পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজেদের প্রোফাইলে, পোস্টে, কমেন্টে, ইনবক্সে, এমনকি স্ক্রিনের সামনে একাকী মুহূর্তেও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই অদৃশ্য ফাঁদ থেকে সতর্ক থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
এ জাতীয় আরো খবর..