✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১১-০৮, | ১৬:৫৩:৪৬ |(বাসস): নাৎসি জার্মানির ‘ক্রিস্টালনাখট’ বা ‘ কাচ ভাঙার রাত’-এর প্রত্যক্ষদর্শী ৯৪ বছর বয়সী জর্জ শেফির কাছে ইহুদিদের ওপর চালানো নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি তুলে ধরা এখন জীবনের শেষ ‘মিশন’। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে নতুন করে ইহুদিবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ায় এ দায়িত্ব তার কাছে আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
সোমবার ‘ কাচ ভাঙার রাত’-এর ৮৮তম বার্ষিকীর আগে এএফপিকে শেফি বলেন, ‘আমরাই শেষ প্রজন্ম, যারা প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে পারব।’
১৯৩৮ সালের ৯ ও ১০ নভেম্বর নাৎসি শাসকগোষ্ঠীর উসকানিতে জার্মানজুড়ে ইহুদিদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়। এতে অন্তত ৯০ জন ইহুদি নিহত হন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় ১ হাজার ৪০০টি উপাসনালয়।
বার্লিন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
১৯৩১ সালে স্পিগেলগ্লাস নামে জন্ম নেওয়া শেফির বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। ওই সময় বার্লিনে তার নিজ শহরেও ইহুদিবিদ্বেষী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
রাজধানীর শোনেবার্গ এলাকায় তাদের বাড়ি থেকে মা তাকে টানা তিন দিন বের হতে দেননি। অবশেষে বাইরে বেরিয়ে তিনি দেখেন, শহরের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
গত বৃহস্পতিবার বার্লিনের নিউ সিনাগগে এক অনুষ্ঠানে এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমার স্কুলটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
হলোকাস্টের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল মার্চ ফর দ্য লিভিং’ ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
শেফি বলেন, ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে, একটি টুপির দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়েছিল। চারদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিল। নারীদের টুপিও পড়ে ছিল। দৃশ্যটি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।’
তার আরেকটি স্মৃতি হলো, এক স্টেশনারি দোকানের মালিক ইহুদিবিদ্বেষী দেয়াললিখন পরিষ্কার করছিলেন। এ সময় কয়েক ডজন মানুষ তাকে বিদ্রƒপ করে।
দোকানের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা হয়েছিল, ‘এই দোকানটি এক ইহুদি শূকরের, যে এক খ্রিষ্টান শূকরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ।’
ভুলে যাওয়ার অধিকার নেই-
এর কয়েক মাস পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে জর্জকে নিরাপত্তার জন্য একটি ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়। তার গন্তব্য ছিল যুক্তরাজ্য। ‘কিন্ডারট্রান্সপোর্ট’ নামে পরিচিত ওই উদ্ধার অভিযানে প্রায় ১০ হাজার শিশুকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
তার মা একটি রেলস্টেশনে তাকে বিদায় জানান। এরপর অন্য একটি স্টেশনে যান ট্যাক্সিতে। সেখান থেকে আরও কয়েকজন শিশুকে তুলে নেওয়ার কথা ছিল।
জর্জ বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমি প্ল্যাটফর্মে মাকে দৌড়াতে দেখেছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে দেখতে পাননি। সেটিই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা।’
প্রথমে লন্ডনে দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের কাছে আশ্রয় পান জর্জ। পরে তাকে ইংল্যান্ডের গ্রামীণ এলাকা লিংকনশায়ারে সরিয়ে নেওয়া হয়।
যুদ্ধের সময় রেডক্রসের মাধ্যমে মায়ের কাছ থেকে মাত্র একটি চিঠি পেয়েছিলেন তিনি। এরপর আর কোনো খোঁজ পাননি।
পরে জানতে পারেন, তার মাকে আউশভিৎসে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৪৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি ওই মৃত্যু শিবিরে পৌঁছান।
জর্জ বলেন, ‘আমার হিসাব অনুযায়ী, সেদিনই তাকে হত্যা করা হয়েছিল।’
হলোকাস্টে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি নিহত হন-
যুদ্ধের পর কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর ইসরাইলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন শেফি।
গত ২৫ বছর ধরে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে জার্মানিতে ফিরে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি স্কুলশিক্ষার্থীর কাছে তিনি তার জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
জার্মানির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তার বার্তা, ‘আমি তোমাদের বোঝাতে চাই, হলোকাস্টের কথা ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
শেফি শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘অতীতে যা ঘটেছে, তার জন্য তোমরা দায়ী নও। কিন্তু বড় হয়ে আগামী ২০-৩০ বছর তোমরা যখন এই দেশ পরিচালনা করবে, তখন কী ঘটবে, তার দায় তোমাদেরই নিতে হবে।’