✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-২৪, | ০১:১৬:২৫ |আলো, বাতাস আর সবুজের মেলবন্ধনে ঘর হয়ে উঠতে পারে আরও প্রাণবন্ত, স্নিগ্ধ ও আরামদায়ক। ঘর সাজাতে দামি আসবাব, বাহারি শোপিস কিংবা নতুন পর্দা কেনাই একমাত্র উপায় নয়। বরং ঘরের আনাচকানাচে গাছপালা, কাঠ, বাঁশ ও বেতের মতো প্রাকৃতিক উপকরণ এবং মৃদু আলোর ব্যবহারেই তৈরি করা যায় প্রকৃতির কাছাকাছি এক সুন্দর পরিবেশ। অন্দরসজ্জার এই ধারার নাম বায়োফিলিক ডিজাইন। সামান্য পরিকল্পনা আর কিছু সহজ পরিবর্তনেই চেনা ঘর হয়ে উঠতে পারে সবুজে ঘেরা প্রশান্তির ঠিকানা।
বায়োফিলিক অন্দরসজ্জা কী?
বায়োফিলিক শব্দটির উৎপত্তি ‘বায়োফিলিয়া’ থেকে, যার অর্থ প্রকৃতির প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণ। এই অন্দরসজ্জার মূল ভাবনা হলো ঘরের ভেতরে প্রকৃতির উপস্থিতি বাড়ানো। গাছপালা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, কাঠ-বাঁশ-বেতের উপকরণ, মাটির রং এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশার মাধ্যমে তৈরি করা হয় এমন পরিবেশ।
বায়োফিলিক অন্দরসজ্জায় দামি জিনিসপত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় পরিকল্পনা ও স্বাভাবিকতা। তাই ঘর ছোট হোক বা বড়, নিজের পছন্দ ও জায়গার সঙ্গে মিলিয়ে সহজেই এই ধারায় সাজানো সম্ভব।
সবুজ পাতায় সাজুক ঘরের কোণ
ঘরের আকার, আলো-বাতাসের পরিমাণ এবং আসবাবের অবস্থান বুঝে গাছ বেছে নিন। বসার ঘরের ফাঁকা কোণে মনস্টেরা, স্নেক প্ল্যান্ট বা ফিডল লিফ ফিগ রাখতে পারেন। বড় পাতার গাছ ঘরের সাজে আলাদা মাত্রা যোগ করবে। তবে গাছ কেনার আগে ঘরে কতটা আলো আসে এবং নিয়মিত পরিচর্যার সুযোগ আছে কি না, তা বিবেচনায় রাখা জরুরি।
কম আলোয় মানিয়ে নিতে পারে এমন জিজি প্ল্যান্ট কিংবা মানিপ্ল্যান্টের কিছু জাত ঘরের ভেতরে রাখা যায়। পিস লিলিও অন্দরসজ্জার জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে প্রতিটি গাছের আলো, পানি ও পরিচর্যার চাহিদা আলাদা।
শোবার ঘরের পাশে ছোট টবে গাছ, জানালার ধারে মানিপ্ল্যান্ট কিংবা বারান্দায় সিঙ্গোনিয়াম, অর্কিড ও মৌসুমি ফুলের গাছ রাখতে পারেন। বারান্দার রেলিংয়ে লতানো গাছ ঝুলিয়ে দিলে জায়গাটি আরও আকর্ষণীয় দেখাবে। গাছের সংখ্যা বেশি না করে বিভিন্ন উচ্চতা ও পাতার আকৃতি মিলিয়ে সাজালে ঘর থাকবে পরিপাটি।
প্রাকৃতিক উপকরণে আসুক উষ্ণতা
শুধু গাছপালা রাখলেই বায়োফিলিক অন্দরসজ্জা সম্পূর্ণ হয় না। ঘরের আসবাব, দেয়ালের রং, পর্দা ও ছোটখাটো ব্যবহার্য সামগ্রীতেও থাকা চাই প্রকৃতির ছোঁয়া।
কাঠের টেবিল, বেতের চেয়ার, বাঁশের ঝুড়ি, পাটের কারুকাজ কিংবা মাটির ফুলদানি ঘরের সাজে আনতে পারে স্বাভাবিক সৌন্দর্য। খাবার টেবিলে প্লাস্টিকের ঝুড়ির বদলে বেত বা বাঁশের ঝুড়ি ব্যবহার করতে পারেন। ছোট মাটির পাত্রে গাছ রাখলেও সাজে যোগ হবে ভিন্নতা।
দেয়ালে কাঠের ফ্রেম, পাটের তৈরি ওয়াল হ্যাঙ্গিং কিংবা প্রকৃতির ছবি ব্যবহার করা যায়। তবে সব উপকরণ একসঙ্গে ব্যবহার না করে রং ও নকশার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখুন। এতে ঘর অগোছালো না দেখিয়ে বরং আরও নান্দনিক হয়ে উঠবে।
আলো-বাতাসে ভরে উঠুক শোবার ঘর
বায়োফিলিক অন্দরসজ্জায় প্রাকৃতিক আলোর গুরুত্ব অনেক। তাই সম্ভব হলে জানালার সামনে ভারী আসবাব না রেখে দিনের আলো ঘরে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করুন। ভারী সিনথেটিক পর্দার বদলে হালকা লিনেন বা সুতির পর্দা ব্যবহার করতে পারেন। এতে ঘরে আলো আসবে, আর জানালা খোলা রাখলে বাতাস চলাচলেও সুবিধা হবে।
শোবার ঘরে কাঠ বা বেতের ল্যাম্পশেড, প্রাকৃতিক রঙের বিছানার চাদর এবং ছোট গাছের সমন্বয় তৈরি করতে পারে শান্ত পরিবেশ। তবে গাছের পরিচর্যা, মাটির আর্দ্রতা ও পোকামাকড়ের বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। যেসব গাছের বেশি আলো প্রয়োজন, সেগুলো অন্ধকার ঘরে রাখা ঠিক নয়।
বারান্দায় তৈরি করুন ছোট সবুজ কোণ
বাড়িতে বড় বারান্দা বা ছাদ থাকলে সেটিকে ছোট সবুজ আশ্রয়ে পরিণত করতে পারেন। কয়েকটি টব, লতানো গাছ, মৌসুমি ফুল আর বেতের চেয়ার-টেবিল দিয়েই তৈরি করা যায় আরামদায়ক বসার জায়গা। কৃত্রিম ঘাসের বদলে বাস্তব গাছের টব ও প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করলে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য আরও ভালোভাবে ফুটে উঠবে।
সকালের রোদে বসে চা পান করা, বই পড়া কিংবা বিকেলে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য এমন একটি কোণ হতে পারে দারুণ। জায়গা কম থাকলে দেয়ালে ঝোলানো টব বা উল্লম্ব বাগানও ভালো বিকল্প। এতে মেঝের জায়গা বেশি না নিয়েই সবুজের সমারোহ তৈরি করা যায়।
মৃদু আলোয় তৈরি হোক মায়াবী আবহ
ঘরের আলো খুব উজ্জ্বল না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী উষ্ণ ও মৃদু আলো ব্যবহার করুন। বসার ঘরের কোণে ফ্লোর ল্যাম্প, খাবার টেবিলের ওপর বাঁশ বা বেতের বুননে তৈরি ঝুলন্ত ল্যাম্পশেড এবং তাকের পাশে ছোট আলো ব্যবহার করা যায়।
বড় পাতার গাছের পাশে মৃদু আলো রাখলে রাতে পাতার ছায়া দেয়ালে সুন্দর নকশা তৈরি করতে পারে। তবে আলো এমনভাবে বসাতে হবে, যাতে তা সরাসরি চোখে না লাগে। মনে রাখতে হবে, সাধারণ ঘরসজ্জার আলো সব গাছের জন্য প্রয়োজনীয় সূর্যালোকের বিকল্প নয়।
অল্প বদলেই ঘরে আসুক প্রকৃতির ছোঁয়া
বায়োফিলিক অন্দরসজ্জার জন্য একসঙ্গে অনেক কিছু কেনার প্রয়োজন নেই। প্রথমে জানালার পাশে একটি গাছ রাখুন, প্লাস্টিকের কয়েকটি সামগ্রীর বদলে প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করুন এবং ঘরে আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ বাড়ান। এরপর ধীরে ধীরে নিজের পছন্দমতো সাজে নতুনত্ব আনুন।
প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার এই সহজ পদ্ধতি ঘরের চেহারা বদলে দেওয়ার পাশাপাশি বসবাসের পরিবেশকেও আরও মনোরম করে তুলতে পারে। সবুজ, আলো আর প্রাকৃতিক উপকরণের ভারসাম্যেই তৈরি হতে পারে এমন এক অন্দর, যেখানে ফিরলেই মনে হবে—এ যেন নিজের ছোট্ট প্রশান্তির জগৎ।