✕


ইউরোপের সঙ্গে ইসরায়েলের দূরত্ব বাড়ছেই, নির্বাচনে কি বদলাবে সমীকরণ?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৮, | ১৪:৪২:৩৫ |

ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে উঠছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের কারণে একসময়কার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেও বাড়ছে অসন্তোষ।

আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন এই সম্পর্কের গতিপথ বদলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।

২০২৩ সালে ইসরায়েলের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছিলেন, ইউরোপ ও ইসরায়েল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ। সেই সম্পর্ক কূটনীতির বাইরেও বিস্তৃত ছিল। ইউরোপীয় ফুটবলে অংশ নিত ইসরায়েল, ইউরোভিশন সংগীত প্রতিযোগিতায় ছিল দেশটির উপস্থিতি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি তাদের অস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্প।

তবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর সেই সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বিরোধ দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের অংশগ্রহণের প্রতিবাদে ইউরোভিশন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। ইউরোপের কিছু ফুটবলার ইসরায়েলি দলের বিপক্ষে খেলতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

আয়ারল্যান্ড ও স্পেন দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নিপীড়নের সমালোচনা করে আসছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সাধারণ অধিবেশনে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন বলেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড বিশ্বকে লজ্জিত করবে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গাজায় নেতানিয়াহুর সরকারের চালানো ‘গণহত্যার’ দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানান।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যও অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগও তুলেছেন।

নেতানিয়াহু ফিরলে সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি কট্টর ডানপন্থীদের নিয়ে আবারও সরকার গঠন করেন, তাহলে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা আর মেরামত করা সম্ভব হবে না।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নিকোলা পেরুজিনিও মনে করেন, নেতানিয়াহু পুনর্নির্বাচিত হলে গাজার মানুষের দুর্বিষহ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েল-ইউরোপ সম্পর্কের আরও অবনতি হতে পারে।

তবে নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কেউ ক্ষমতায় এলেও নীতিগত পরিবর্তন নিশ্চিত নয়। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে হলে ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও মানবিক সহায়তা, বসতি সম্প্রসারণ কমানো এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।

জনমতের চাপে বদলাচ্ছে ইউরোপের অবস্থান
বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে মানবাধিকার সংগঠন, পেশাজীবী, শ্রমিক সংগঠন ও বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভকারীদের চাপ ইউরোপের সরকারগুলোকে অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নেভে গর্ডনের মতে, ইউরোপের কয়েকটি দেশের শাসকগোষ্ঠী এখন জনমতের সঙ্গে নিজেদের অবস্থানের সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বসন্ত থেকে চলতি বছরের বসন্ত পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব যুক্তরাজ্যে ৬১ থেকে বেড়ে ৬৯ শতাংশ, ইতালিতে ৬৬ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৬৪ থেকে ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

তবে ইউরোপের সব দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়নি। জার্মানিসহ কয়েকটি দেশে ইসরায়েলকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার নীতিও বহাল রয়েছে।

ইসরায়েলের নির্বাচনে গুরুত্ব পাচ্ছে না কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা
ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রচারে নিরাপত্তা, হামাস ও হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতার তদন্তই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রতি ৯২ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে অনেক ইসরায়েলি ৭ অক্টোবরের হামলার পর নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। ফলে নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হলেও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের সংকট দ্রুত কাটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সূত্র: আল-জাজিরা


শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..