বাংলাদেশে কৃষি, অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যবসায় অর্থায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ৩৯০ কোটি টাকা (৪ কোটি ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার) অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দেশটির আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাইয়ের বাংলাদেশ সফরকালে চারটি নতুন উদ্যোগের আওতায় এ অর্থায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে ঢাকার কানাডীয় হাইকমিশন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই। কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং জনগণের জন্য উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরিই ছিল এ সফরের মূল উদ্দেশ্য।
সফরকালে চারটি উদ্যোগে ৪ কোটি ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার অনুদানের ঘোষণা দেন প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডা ও কোওয়াটার ইন্টারন্যাশনালকে ১ কোটি ৮০ লাখ কানাডীয় ডলার করে, বিশ্বব্যাংককে ৫০ লাখ এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি) ৪০ লাখ কানাডীয় ডলার দেওয়া হবে।
বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডার মাধ্যমে কানাডার কৃষি খাতের উদ্ভাবকদের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য খাতের সংযোগ বাড়ানো হবে। এর লক্ষ্য খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা। কোওয়াটার ইন্টারন্যাশনালের অর্থায়নে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সহজ করা, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর কানাডাসহ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশ্বব্যাংকের জন্য বরাদ্দ অর্থ অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগে ব্যয় হবে। অন্যদিকে, আইএফসির মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতের বিকাশে সহায়তা করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে কানাডা ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি ৬৩০ কোটি কানাডীয় ডলারের বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৪০০ কোটি কানাডীয় ডলার ছাড়িয়েছে।
সফরকালে প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি ও জলবায়ু অর্থায়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে বাংলাদেশ, কানাডা ও অন্যান্য অংশীদারের যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্ব নিয়েও মতবিনিময় করেন তাঁরা।
সফরকালে রণদীপ সারাই ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে কানাডার সহায়তায় তরুণ-তরুণীরা, বিশেষ করে নারীরা, কীভাবে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন, সে বিষয়ে তাঁকে অবহিত করা হয়।
কানাডা, ব্র্যাক ও অস্ট্রেলিয়ার একটি বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে গত পাঁচ বছরে ৪ কোটি ৪০ লাখ কানাডীয় ডলার সহায়তা দিয়েছে কানাডা।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) হাসপাতাল পরিদর্শনকালে কানাডার সহায়তায় পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের বিষয়েও জানতে পারেন প্রতিমন্ত্রী। এসব গবেষণার মাধ্যমে সাশ্রয়ী ও জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্যসমাধান তৈরি হচ্ছে, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের উপকারে আসছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইসিডিডিআর,বির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনায় কানাডা ১ কোটি ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার অনুদান দিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া কানাডাই একমাত্র দেশ, যারা প্রতিষ্ঠানটিকে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এ ছাড়া যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যা ও ঘাটতি নিয়ে গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ২ কোটি ৪০ লাখ কানাডীয় ডলার সহায়তা দিয়েছে দেশটি।
কক্সবাজার সফরে রণদীপ সারাই নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা করেন। ২০১৮ সাল থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য কানাডার ৬০ কোটি কানাডীয় ডলারের বেশি সহায়তার বিষয়ে তাঁকে অবহিত করা হয়। এ সহায়তা শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও জীবিকার সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।
সফরকালে তিনি শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ, কানাডা ও আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিমিট) একটি প্রদর্শনী কেন্দ্রও পরিদর্শন করেন কানাডার প্রতিমন্ত্রী। সেখানে গবেষণার মাধ্যমে কৃষকেরা কীভাবে ফসলের উৎপাদন বাড়াচ্ছেন, খাদ্যের চাহিদা মেটাচ্ছেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করছেন, তা দেখেন তিনি।
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো ও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে কৃষি খাতে উদ্ভাবনী পদ্ধতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে সিমিট বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডার সঙ্গে কাজ করবে।
ঢাকা সফরের অংশ হিসেবে গিলডান অ্যাকটিভওয়্যার বাংলাদেশ লিমিটেডও পরিদর্শন করেন রণদীপ সারাই। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কানাডার অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক কার্যক্রম রয়েছে।
এ পরিদর্শনে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক উঠে আসে। পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
এ জাতীয় আরো খবর..