আজ ৩০ বছর হয়ে গেল সালমান শাহ নেই

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-০৬, | ১৫:০৮:৪৬ |
বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা চিত্রনায়ক সালমান শাহ নেই আজ ৩০ বছর। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সমকালীন ঢাকাই চলচ্চিত্র অঙ্গনে বড় শূন্যতা তৈরি করে বিদায় নেন কালজয়ী এই নায়ক।

ওইদিন রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুবার্ষিকী এবং জন্মদিন এলেই যে তাকে নিয়ে আলোচনা হয় এমনটি নয়।

পুরো বছরজুড়ে নানান কারণে তিনি আলোচনায় থাকেন।

সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সালমান শাহর স্মরণে ৩ দিনের উন্মুক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) কর্তৃপক্ষ।

প্রতিদিন বিকেল ৪টায় ভিআইপি প্রজেকশন হলে দর্শকদের জন্য সিনেমাগুলো প্রদর্শিত হবে। ৬ থেকে আট সেপ্টেম্বর যথাক্রমে প্রদর্শিত হবে সালমান শাহ অভিনীত ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ও ‘তোমাকে চাই’।
 
এদিকে প্রয়াত এই নায়ককে স্মরণে সপ্তাহজুড়ে বিশেষ আয়োজন করেছে দীপ্ত টিভি। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ সেপ্টেম্বর- টানা সাত দিন দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে প্রচারিত হচ্ছে সালমান শাহ অভিনীত সাতটি জনপ্রিয় সিনেমা। ওগুলো হচ্ছে- ‘বিচার হবে’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘জীবন সংসার’, ‘প্রেম পিয়াসী’ ও ‘স্বপ্নের পৃথিবী’।

এক নজরে সালমান শাহ
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। তার পিতার নাম কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা নীলা চৌধুরী।

সালমানের দাদার বাড়ি সিলেট শহরের শেখঘাটে আর নানার বাড়ি দারিয়া পাড়ায়। যে বাড়ির নাম এখন ‘সালমান শাহ হাউজ’।
সালমানের নানা পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়ে সালমানও তাই সেই নানার কারণেই আসা। স্কুলে পড়ার সময় সালমান শাহ বন্ধুমহলে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লীগীতিতে পাস করেছিলেন তিনি।

চলচ্চিত্রে আসার আগেই ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট বিয়ে করেন তিনি। তার স্ত্রী ছিলেন সামিরা হক। যদিও বা সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় অভিনয় করেই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পান সালমান শাহ। কিন্তু তার আগেই তিনি নাটকে অভিনয় করেন।

মঈনুল আহসান সাবেরের লেখা ধারাবাহিক ‘পাথর সময়’-এ একটি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে সালমান শাহ’র অভিনয় জীবন শুরু হয়। ওই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে তৌকীর আহমেদ অভিনয় করলেও সালমান শাহ’র চরিত্রটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে আরো বেশকিছু নাটকে অভিনয় করেও দারুণ প্রশংসিত হয়েছিলেন সালমান।

সিনেমার পাশাপাশি নাটকেও তার উপস্থিতি দর্শকের মধ্যে ভীষণ সাড়া ফেলেছিলো। যদিওবা মৌসুমীর সঙ্গে সিনেমাতে সালমানের অভিষেক হয়। পরবর্তীতে মৌসুমীর সঙ্গে আরো দুটি সিনেমাতে অভিনয় করেছিলেন। শাবনূরের সঙ্গেই বেশি সিনেমাতে অভিনয় করেছেন সালমান শাহ। এই জুটিকে এখনো সিনেমার অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। সালমান শাহর সঙ্গে জুটি হয়ে আরো অভিনয় করেছিলেন শাবনাজ, শাহনাজ, লিমা, শিল্পী, শ্যামা, সোনিয়া, বৃষ্টি, সাবরিনা ও কাঞ্চি।

জীবদ্দশায় সালমান শাহ নিজের অভিনীত যেসব সিনেমার সফলতা উপভোগ করে যেতে পেরেছিলেন সেই সিনেমাগুলো হলো ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘তুমি আমার’,‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখি’, ‘বিক্ষোভ’, ‘প্রেম যুদ্ধ’,‘ কন্যাদান’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আঞ্জুমান’, ‘মহামিলন’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘ প্রিয়জন’, ‘তোমাকে চাই’ ও ‘স্বপ্নের পৃথিবী’।

সালমান শাহ’র জীবদ্দশায় সর্বশেষ ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ সিনেমার সাফল্য উপভোগ করে যেতে পেরেছিলেন। সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৬ সালের ১২ জুলাই। সালমান শাহ যেদিন মারা যান সেদিন রায়হান মুজিব পরিচালিত ‘আখেরী মোকাবেলা’ সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল। আর এর পরের সপ্তাহ অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বর (১৯৯৬) মুক্তি পেয়েছিল ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ সিনেমাটি।  

সালমান শাহ’র মৃত্যুর পর যে সিনেমাগুলো একের পর এক দর্শকের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয় এবং ব্যবসাসফল হয়, সেই সিনেমাগুলো হচ্ছে ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘শুধু তুমি’, ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘বুকের ভেতর আগুন’।

সালমান শাহ’র মৃত্যুর ঠিক এক বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তার অভিনীত সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ছিল ‘বুকের ভেতর আগুন’।  

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় চলমান আইনি প্রক্রিয়া

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।

তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি বলে, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেন। কিন্তু সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত।

এর দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ অগাস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়। কিন্তু সালমানের মা নীলা চৌধুরী মামলটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। ১১ জনের নাম উল্লেখ করে নীলা চৌধুরী দাবি করেন, এরা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

মামলাটি এরপর তদন্ত করে র‌্যাব। তখন রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন। তখন তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

সেখানেও বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে এবং জব্দ আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদনে বলে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরার কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ‘অভিমানী’ সালমান আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

ওই প্রতিবেদনেও অসন্তুষ্টি জানিয়ে ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে আরও তদন্ত চান নীলা চৌধুরী। এর মধ্যে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

এরপর আবার সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।

সবশেষ গেল ৯ আগস্ট সালমান শাহ হত্যা মামলায় নাম থাকায় সৌদি আরব যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে আটকে দেয় ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর ডনকে আদালতে পাঠিয়েছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরপর গত ২০ আগস্ট তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির পরিদর্শক আরিফুর রহমান। ওই আদালত রিমান্ড শুনানির জন্য ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করেন। ২৭ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়ের রানা ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..