✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-০৬, | ১৪:৫৯:০৫ |গত ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশূলী এলাকায় বন্যার পানি বাড়তে শুরু করলে ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসেন পারিয়ার। তিন মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে এখন তাকে অপরিচিত বহু মানুষের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকতে হচ্ছে। সেখানে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও তিনি প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত পরিবেশ পাচ্ছেন না।
পারিয়ার বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে পুরুষদের ধূমপান, মদের গন্ধ এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে তার শিশুর ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে। বন্যার পর থেকে তার বুকের দুধও কমে গেছে। শিশুকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করলেও তাতে শিশুর পেটে সমস্যা হচ্ছে এবং কান্না আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই একই জায়গায় থাকছি, তাই খুবই কঠিন। নিরাপদ একটি জায়গা থাকলে ভালো হতো। এখানে শিশুর টিকাও দেওয়া হচ্ছে না। সময়মতো খাবারও পাচ্ছি না, পর্যাপ্ত খাবারও মিলছে না।’
পারিয়ারের মতো পরিস্থিতিতে পড়েছেন আরও অনেক নারী। বন্যা ও ভূমিধসে রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাঠমান্ডুর উত্তর-পশ্চিমে ভোতেকোশি-ত্রিশূলী করিডরের দুর্গত এলাকায় গর্ভবতী নারী ও নতুন মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের প্রয়োজন বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য নারীবান্ধব ও ব্যক্তিগত জায়গা, সময়মতো পুষ্টিকর খাবার এবং প্রসবকালীন জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যবস্থা। কিন্তু দুর্গত এলাকার ত্রাণব্যবস্থা মূলত সব বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য একই ধরনের প্রয়োজন ধরে নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) জানিয়েছে, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার ১৫টি পৌর এলাকায় আনুমানিক ৪ হাজার ৪৩০ জন গর্ভবতী নারী রয়েছেন।
এই সংখ্যা সরাসরি গণনা করে পাওয়া নয়; প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ওপর ভিত্তি করে মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার জন্য করা একটি হিসাব। এ হিসাবে আগামী এক মাসে প্রায় ৪৯২টি সন্তান জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭৪ জন নারীর জরুরি প্রসূতিসেবা প্রয়োজন হতে পারে।
আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের জন্যও নেই আলাদা খাবার
পারিয়ারের অভিজ্ঞতা একা নয়। একই এলাকার আরেকটি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৩ বছর বয়সী শর্মিলা শ্রেষ্ঠা দুই শিশুকে নিয়ে একটি শ্রেণিকক্ষের মেঝেতে ঘুমাচ্ছেন। তাদের একজন তার ১৪ মাস বয়সী মেয়ে। বন্যার পর দুই-তিন দিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর পাহাড়ি পথে প্রায় ছয় ঘণ্টা হেঁটে মেয়েকে উদ্ধার করে আনেন তিনি। অন্য শিশুটি তার দেবরের ১৮ মাস বয়সী ছেলে। আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের জন্য আলাদা কোনো খাবারের ব্যবস্থা নেই। ফলে বড়দের জন্য রান্না করা খাবারই শিশুদের খাওয়াতে হচ্ছে।
শর্মিলা বলেন, ‘শিশুদের জন্য কোনো বিশেষ খাবার দেওয়া হচ্ছে না। আমরা বাধ্য হয়ে ছোট শিশুকেও বড়দের মতো ভারী খাবার খাওয়াচ্ছি।’
তার মতে, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত থাকার জায়গা। তিনি বলেন, ‘শুধু যদি থাকার জন্য একটি ভালো, উপযুক্ত জায়গা পেতাম, তাহলে কিছুটা মানসিক শান্তি পাওয়া যেত।’
হাসপাতালেও বেড়েছে চাপ
শুধু আশ্রয়কেন্দ্রেই নয়, বন্যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও। ত্রিশুলি হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগ এখন অনেকটা জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
হাসপাতালটির প্রসূতি বিভাগের দায়িত্বে থাকা বাসন্তী পানচা জানান, বন্যার পর হাসপাতালটিতে নয়টি সন্তান প্রসব হয়েছে। এর পাশাপাশি জ্বর, গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের নড়াচড়া কমে যাওয়া এবং মূত্রনালির সংক্রমণের মতো সমস্যা নিয়েও নারীরা হাসপাতালে আসছেন।
তিনি বলেন, ‘বন্যার কারণে আমাদের সেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।’
বিদ্যুৎ সরবরাহও অনিয়মিত। অস্ত্রোপচারের সময় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করতেও ছোট ছোট ব্যাচে হাতে করে কাজ করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চারজন প্রসূতি রোগীকে অন্যত্র পাঠাতে হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনকে সামরিক হেলিকপ্টারে এবং দুজনকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয়। তাদের একজন প্রসবের পর গুরুতর ক্ষত সংক্রমণে ভুগছিলেন।
বাসন্তী পানচা বলেন, আগে কাঠমান্ডুতে সড়কপথে যেতে মাত্র দুই ঘণ্টা লাগত। এখন ভূমিধসের কারণে সড়কপথে কত সময় লাগবে, তা কেউ জানে না।
তার মতে, পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে উঠলে হাসপাতালটির উন্নত নবজাতক পরিচর্যা ইউনিট না থাকায় রোগীকে অন্যত্র পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আগে যেসব চিকিৎসা ছিল নিয়মিত, সেগুলো এখন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বড় ধরনের চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গর্ভাবস্থাই স্বাভাবিকভাবে একজন নারীর মধ্যে উদ্বেগ, চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। তার ওপর বন্যা এসব নারীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।’
আশ্রয়কেন্দ্রে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি
নারী অধিকার সংগঠন উইমেনস রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার (ডব্লিউওআরইসি) নেপালের নির্বাহী পরিচালক রেখা শ্রেষ্ঠা বলেন, তারা যেসব আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করছেন, প্রায় সব জায়গাতেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নারী, পুরুষ, শিশু, অসুস্থ ও সুস্থ—সবাইকে একই জায়গায় থাকতে হচ্ছে।
চন্দ্রাবতী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজারের বেশি মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫০০-এর বেশি নারী, যাদের মধ্যে গর্ভবতী ও সদ্য মা হওয়া নারীও আছেন।
রেখা বলেন, তার সংগঠন দুর্গত এলাকায় নারীবান্ধব নিরাপদ জায়গা তৈরির কাজ শুরু করেছে। এসব জায়গায় নারী ও কিশোরীরা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এবং এমন বিষয় জানাতে পারছেন, যা ভিড়ের মধ্যে বলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ত্রাণ বিতরণে প্রায়ই ধরে নেওয়া হচ্ছে যে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা সবার প্রয়োজন একই। ফলে ঋতুস্রাব হওয়া কিশোরীদের পর্যাপ্ত স্যানিটারি প্যাড দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কোথাও একজন নারীকে একটি প্যাড দিয়ে তিন-চার দিন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া যৌন সহিংসতা ও মানবপাচারের ঝুঁকিও বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় অনেক পরিবার কাঠমান্ডুর দিকে ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
রেখা বলেন, ‘গর্ভবতী নারী ও প্রসব-পরবর্তী মায়েদের বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। গোসল করা, কাপড় শুকানো কিংবা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য তাদের কোনো ব্যক্তিগত জায়গা নেই। দুর্যোগের সময় গোপনীয়তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, এটি একটি প্রয়োজনীয়তা।’
তিনি দুর্গত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আলাদা করা, নারী ও বয়সভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ এবং নারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
‘শিশুরা রাস্তা খুলে যাওয়ার অপেক্ষা করে না’
ইউএনএফপিএও জানিয়েছে, ৪ হাজার ৪৩০ জন গর্ভবতী নারীর হিসাবটি প্রাথমিক। নেপালের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ক্লাস্টারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের কাজ চলছে।
নেপালে ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি শ্রীরাম হরিদাস বলেন, আক্রান্ত এলাকার মোট জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে একটি প্রচলিত জনমিতিক অনুপাত ব্যবহার করে এই হিসাব করা হয়েছে। এখন মাঠপর্যায়ে নারীদের শনাক্ত করে তাদের কাছে পৌঁছানোর কাজ চলছে, যা শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
এই মুহূর্তে প্রসূতিসেবা সচল রাখা এবং জরুরি রোগীদের অন্যত্র পাঠানোর ব্যবস্থা পুনর্গঠন করাই প্রধান লক্ষ্য।
হরিদাস বলেন, ‘শিশুরা রাস্তা খুলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে না।’
ইউএনএফপিএ মোবাইল স্বাস্থ্যদল দিয়ে গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা এবং মানসিক সহায়তা দিচ্ছে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে ২ হাজার ডিগনিটি কিট, ৮০০ কিশোরী কিট এবং ৩০০টি আশ্রয়কেন্দ্রের ত্রিপল পাঠিয়েছে। এ ছাড়া আরও ৩২টি প্রজননস্বাস্থ্য কিট ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তবে শুধু কোনো নারীকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন হরিদাস। তার ভাষায়, ওই নারীকে জানতে হবে কোথায় গেলে চিকিৎসা পাওয়া যাবে এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সহায়তার জন্য কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বন্যার পর বাস্তুচ্যুত এসব নারীর সংকট মূলত সেখানেই—তাদের সংখ্যা হয়তো হিসাব করা হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী সেবা পৌঁছাচ্ছে না। সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট।