লুঙ্গির কোচে রাখা টাকা দেখে যাত্রী ইসমাইল হোসেনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বাসের সুপারভাইজার ও চালক। পরে নির্ধারিত গন্তব্যে না নামিয়ে বাসের মধ্যেই তাকে হাত-মুখ বেঁধে হত্যা করা হয়।
লাশ ফেলে রাখা হয় রাজধানীর বনানী এলাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে। এ ঘটনায় ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে এক সংবাদ সম্মেলনে বনানী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে লাশ উদ্ধার ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের বিষয়ে এসব তথ্য জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন।
গ্রেপ্তাররা হলেন– বাসচালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) ও হেলপার মো. মনির হোসেন (১৯)।
মো. ফারুক হোসেন বলেন, গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকাল আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে বনানী থানাধীন এয়ারপোর্টগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় অজ্ঞাত পরিচয়ের এক পুরুষের লাশ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ।
খবর পেয়ে বনানী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
এসময় মৃত ব্যক্তির মুখ ও দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে প্যাঁচানো এবং গলায় কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায়। পরে সুরতহাল শেষে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তার নাম ইসমাইল হোসেন। পরিবারের সদস্যরাও থানায় এসে লাশের ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে বাদী হয়ে বনানী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ইসমাইল হোসেন জামালপুরের নিজ গ্রাম থেকে জমি বিক্রির প্রায় ৫ লাখ টাকা নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তার ছেলে হাসান জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে ইসমাইলের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে। একপর্যায়ে একটি বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে সেটিকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়। পরে জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের বাসটি জব্দ করা হয়। একইসঙ্গে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং হেলপার মো. মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযানে বাসচালক সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানান মো. ফারুক হোসেন।
তিনি বলেন, গত শুক্রবার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুরের দিকপাই বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইলকে ওই বাসে যাত্রী হিসেবে তোলা হয়। একপর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু ভাড়া চাইলে ইসমাইল কোমরের লুঙ্গির কোচ থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেন। এসময় লুঙ্গির কোচে থাকা বিপুল পরিমাণ টাকা দেখতে পান সুপারভাইজার। পরে তিনি বিষয়টি বাসচালককে জানান ও ইসমাইলের কাছে অনেক টাকা রয়েছে বলে ধারণা দেন। এরপর ওই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন চালকসহ অন্যরা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী চান্দুরা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে না নামিয়ে বাসের অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। ইসমাইলকে বলা হয়, ঘুমিয়ে থাকুন, নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে ডেকে নামিয়ে দেওয়া হবে। ইসমাইল ঘুমিয়ে পড়ার পর সুযোগ নিয়ে তাকে নির্ধারিত গন্তব্যে না নামিয়ে বাসটি ঢাকার দিকে নিয়ে আসা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলের হাত ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরে গামছা প্যাঁচিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
মো. ফারুক হোসেন বলেন, হত্যার পর বাসটি এয়ারপোর্ট থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বনানীর দিকে আসে। পরে ইউটার্ন নিয়ে আবার এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়ার সময় এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ইসমাইলের লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা।
নিহতের কাছে জমি বিক্রির পাঁচ লাখ টাকা থাকলেও গ্রেপ্তাররা পুরো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেননি বলে জানান তিনি।
জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছে বলে জানান ডিএমপির এই কর্মকর্তা। তবে বাকি টাকার বিষয়ে তদন্ত চলছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এ জাতীয় আরো খবর..