যার জীবন আপনার চিন্তাকেও ঝাঁকুনি দেবে

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-০৬, | ০০:৪৪:১৯ |
ইতিহাসের কি সত্যিই কোনো শেষ আছে? নাকি মানবজাতি চিরকালই এক অনন্ত সংগ্রামের ঘূর্ণাবর্তে আটকে আছে? বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। পালো আল্টোর ক্যালিফোর্নিয়ার অফিস থেকে রয়টার্সকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি উন্মোচন করেছেন তাঁর নতুন আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ—‘ইন দ্য রিয়েলম অব দ্য লাস্ট ম্যান’। 

জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বহুবার নিজের মতামত বদলানোর কথা অকপটে স্বীকার করেছেন এই প্রাজ্ঞ তাত্ত্বিক। ইরাক আগ্রাসনের জোরালো সমর্থন থেকে শুরু করে মুক্তবাজার অর্থনীতির সর্বাঙ্গীন সাফল্যের বিশ্বাস; সবকিছুতেই তিনি এনেছেন আমূল পরিবর্তন। এমনকি এখন তিনি আর নিজেকে কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল বলেও পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বিতর্কিত অবদান; ১৯৮৯ সালের সেই বিখ্যাত প্রবন্ধ ও গ্রন্থ ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি’ নিয়ে সমালোচকদের তীব্র কটাক্ষের মুখে আজো পড়তে হয় তাকে। ফুকুয়ামা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তার সমালোচকরা আসলে তার মূল বক্তব্যটিকে সম্পূর্ণ ভুল বুঝেছেন। জার্মান দার্শনিক গেওরগ হেগেলের ঐতিহাসিক তত্ত্ব থেকে ধার করা এই বাক্যের অর্থ কখনই কোনো ঘটনার চিরতরে থেমে যাওয়া ছিল না বরং এটি ছিল মানব ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য বা দিকনির্দেশ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যখন অবধারিত হয়ে উঠেছিল, তখন তার যুক্তি ছিল ইতিহাসের পরবর্তী এবং চূড়ান্ত ধাপটি হতে পারে গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির একটি সফল সমন্বয়।

 কিন্তু বইটির মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে ছিল এর পূর্ণ শিরোনামে 'দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’। ফ্রিডরিখ নিটশের সেই ‘লাস্ট ম্যান’ বা শেষ মানব ধারণার কথা টেনে ফুকুয়ামা ব্যাখ্যা করেছেন যে, মানুষ কেবল শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না, মানুষ চায় সংগ্রামের জন্য সংগ্রাম। বিগত প্রজন্মে গণতন্ত্রের জয় সুনিশ্চিত হওয়ায়, আজকের মানুষ সেই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেই লড়তে শুরু করেছে; যা আজ বাম ও ডানপন্থী পপুলিজমের উত্থানের মূল রহস্য।

ভুল স্বীকারের এই সাহস তাঁকে বিচ্ছিন্ন করেছে বহু পুরোনো মিত্রদের থেকে। জর্জ বুশের আমলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের বিরোধিতা করে তিনি ভেঙে দিয়েছিলেন দীর্ঘদিনের নিওকনজারভেটিভ বন্ধুদের বলয়, যা তার ব্যক্তিগত জীবনেও ডেকে এনেছিল দীর্ঘ পনেরো থেকে বিশ বছরের নীরবতা। ফুকুয়ামা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, রাজনীতিবিদরা কখনোই ভুল স্বীকার করতে চান না, অথচ নিজের ভুল বুঝতে পারাটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট এবং ইরাক যুদ্ধের বিপর্যয় তাকে বাধ্য করেছে রক্ষণশীলতার গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসতে। তিনি উপলব্ধি করেছেন, মার্কিন নব্য উদারনৈতিক নীতি বা বাজারের ওপর অন্ধ নির্ভরতা পুরোপুরি ভুল ছিল বরং আধুনিক গণতন্ত্রের স্থায়িত্বের পেছনে সমাজতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী এজেন্ডার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের চরম মেরুকরণের চিত্র। বর্তমানে রাজনীতি কেবল নীতিগত দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা রূপ নিয়েছে আবেগগত মেরুকরণে, যেখানে একে অপরের প্রতি অন্ধ অবিশ্বাসের দেয়াল এতটাই চওড়া যে কারও পক্ষে মন বদলানো বা গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর ঠিক পরেই মানব সভ্যতার সামনে উপস্থিত হয়েছে এক মহাবিপর্যয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

ফুকুয়ামা সতর্ক করে বলেছেন, এআই মধ্যবিত্তের সম্মানজনক চাকরিগুলো গ্রাস করে নেবে এবং বিপুল ধনসম্পদ কেন্দ্রীভূত করবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এটি মানবসত্তার স্বকীয়তা এবং মর্যাদাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে পারে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

ভবিষ্যতের উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থার সামনে আরও দুটি মারাত্মক সংকটের কথা তুলে ধরেছেন ফুকুয়ামা। প্রথমত, নিয়মের গোলকধাঁধায় আটকে থাকা অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক বিধিমালা, যার ফলে রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো নির্মাণের মতো মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো নেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তির বিপজ্জনক একীভূতকরণ; যা মানুষের মৌলিক প্রকৃতি ও জিনগত বৈশিষ্ট্যকে বদলে ফেলার সুযোগ তৈরি করছে। আর এই পরিবর্তন সরাসরি আঘাত হানবে মানবাধিকারের ভিত্তিমূলে, কারণ আমাদের মানবাধিকারের সম্পূর্ণ ধারণাটিই গড়ে উঠেছে মানুষের নির্দিষ্ট প্রজাতিগত সত্তার ওপর ভিত্তি করে। 

সূত্র: রয়টার্স 

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..