নেপালে টানেলে আটকে পড়া মানুষের অভিজ্ঞতা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-৩১, | ০১:৩৭:৪৪ |

নেপালে বুধবারের বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছিলেন ত্রিশূলী এলাকায় বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে কাজ করা শ্রমিকরা। পাহাড়ি নদীগুলোর তীব্র শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য এসব এলাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেল পাহাড়ের অনেক গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন টানেলে অন্তত ১ হাজার শ্রমিক কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জন জলবিদ্যুৎ শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে, অথবা তারা নিজেরাই কাদা ও পলিমাটিতে ভরা টানেল থেকে কোনোমতে হেঁটে বের হতে পেরেছেন। তবে অনেকেই এখনো ভেতরে আটকে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

ত্রিশূলী থ্রি-এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উদ্ধারকারীরা শনিবার রাত থেকে শুরু করে রবিবার পর্যন্ত অবিরাম কাজ করে গেছেন। তারা টানেলের ভেতর বাতাস পৌঁছানো এবং খাবার পাঠানোর জন্য ওপর থেকে ড্রিল করে গর্ত করার চেষ্টা করছেন; এই আশায়, যদি ভেতরে আটকে থাকা কোনো জীবিত মানুষের সন্ধান মেলে।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন বেঁচে ফেরা শ্রমিক ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। ত্রিশূলী নদীর তীরে একটি টানেলে কাজ করছিলেন রাম চন্দ্র। অন্ধকারের বুক চিরে যখন পানি, কংক্রিট আর ধ্বংসাবশেষ ধেয়ে আসছিল; যা তাকে প্রায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল; তখন রাম চন্দ্র টানেলের ছাদে লাগানো একটি রিং বা রড শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন। তার এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও তৎপরতাই সম্ভবত তার জীবন বাঁচিয়েছিল। তিনি এবং তার সাথে থাকা সহকর্মীদের ছোট দলটি টানেলের শেষ প্রান্ত থেকে শত শত মিটার গভীরে ছিলেন। 

সে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে রাম চন্দ্র বলেন, ‘পানি বাড়ছিল এবং আমার পা নাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। আমি যদি সেই রিংটি ছেড়ে দিতাম, তবে পড়ে যেতাম।’ 

নিজের পায়ের নিচে দেওয়ার জন্য তিনি একটি টিনের শিট টেনে নেন এবং পরে সেটি দলের বাকিদের মাঝেও বাড়িয়ে দেন। এভাবে একেকটি রিং আঁকড়ে ধরে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে তারা ইঞ্চি ইঞ্চি করে সামনের দিকে এগিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, ’আমরা ছয়জন ছিলাম এবং পরে টানেলের প্রবেশদ্বারে আরও একজনকে পাই।’ তারা যখন টানেল থেকে বের হয়ে আসেন, ততক্ষণে পানির তোড়ে তাদের গায়ের পোশাক পর্যন্ত ভেসে গিয়েছিল।

নেপালি সেনাবাহিনীর ধারণ করা ভিডিওতে রাসুয়া জেলায় বন্যা কবলিত একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের টানেলের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা দেখা যায়। পরদিন দিনের আলো ফুটলে তারা বন্যার রেখে যাওয়া সেই ভয়াবহ ধ্বংসলীলা দেখতে পান; নিচে তখনো বয়ে চলেছে কাদা, বরফ আর পলি মিশ্রিত কালো রঙের গর্জে ওঠা নদী। ওপরের পাহাড়গুলো থেকে নেমে আসা সেই প্রলয়ঙ্করী ঢল ভাটির দিকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, কেড়ে নিয়েছে শত শত মানুষের প্রাণ এবং মাটির নিচে চাপা দিয়েছে আস্ত কিছু জনপদকে।

বেঁচে যাওয়া অল্প কয়েকজন মানুষের মধ্যে একজন মদন সিং বুধা। যখন এই ভয়াবহ জলপ্লাবন আঘাত হানে তখন আপার ত্রিশূলী সুড়ঙ্গ নম্বর ২-এর রাতের শিফটের কাজ শেষ করে কেবল বের হয়েছিলেন তিনি। রোববার হেলিকপ্টারে করে দুর্যোগ কবলিত এলাকা থেকে নিচে নামিয়ে আনার পর সিএনএনকে মদন সিং বলেন, ‘যখন আমি বাইরের দিকে তাকালাম, শুধু পানি দেখতে পাচ্ছিলাম এবং তাই আমি পাহাড়ের ওপরের দিকে দৌড়াতে শুরু করলাম। পাহাড়টি ছিল পাথুরে, যার খাঁজে খাঁজে ঘাস জন্মেছিল। আমরা ওপরে ওঠার সময় সেই ঘাসগুলোকেই আঁকড়ে ধরেছিলাম। যারা ওপরে উঠতে পারেনি, তারা ভেসে গেছে।’ 

নিজেরা বেঁচে আসার পর তারাই তাদের সহকর্মীদের জন্য এক মরিয়া ও বিভ্রান্তিকর অনুসন্ধানে শরিক হন। এই দলের প্রত্যেকেই তাদের কোনো না কোনো আত্মীয় বা বন্ধুকে হারিয়েছেন। রাম চন্দ্রর মতো অনেকেই স্রোতের তোড়ে তাদের পরিধেয় কাপড়চোপড়ও হারিয়েছিলেন। নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার পর গ্রামবাসীদের দেওয়া ধার করা প্যান্ট, শার্ট এবং স্যান্ডেল পরেছিলেন তারা।

ভক্তি রাম বোহরা এই বেঁচে যাওয়া মানুষদেরই একজন। তার হিসাব অনুযায়ী, তিনি খুব অল্পসংখ্যক সৌভাগ্যবানদের একজন যিনি বেঁচে ফিরতে পেরেছেন। তিনি ধারণা করেন যে, তার এবং আশেপাশের অন্যান্য প্রকল্পে প্রায় এক হাজার মানুষ কাজ করছিলেন। নিখোঁজদের মধ্যে বোহরার ভগ্নিপতিও রয়েছেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে বোহরা বলেন, ‘তার স্ত্রী আমার বোন এবং সে এখন অন্তঃসত্ত্বা।’

ট্যুর গাইড অমর বিস্তা এখানে কাজ করতেন না। ভয়াবহ বিপর্যয়ের খবর পেয়ে ছুটে আসেন তিনি। কারণ তার পরিবারের বহু সদস্য এবং বন্ধুরা ওইসব টানেলে কাজ করতেন। যাদের তিনি বাঁচাতে সাহায্য করেছিলেন, সেই দলটির সাথে দাঁড়িয়ে চারপাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের দিকে ইশারা করে অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, ‘জানেন, এরা সবাই আমার এলাকার মানুষ।’ 

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে মানুষের জীবিত উদ্ধার হওয়ার গণমাধ্যমের রিপোর্টের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,‘মানুষ এখনো আশা ধরে রেখেছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শূন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক রাত আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমাতে পারি না। জানেন, আমার কিছু খালাতো-ফুফাতো ভাই ও বোন তাদের সন্তানদের হারিয়েছে। আপনি শুধু ভাবুন, মাত্র ১৮ বছরের বাচ্চা ছেলেমেয়ে!’

উদ্ধার অভিযানের জন্য দুর্ঘটনাস্থলের ওপরের দিকে এমন কিছু করা প্রয়োজন ছিল যা ভাবাই যায় না; আর তা হলো, সেই সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরেই আবার প্রবেশ করা যা তার এলাকার এতগুলো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সেখানে আর কেউ ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু তারা তাদের বন্ধুদের ফেরত চায়।’

এসব টানেলে কাজ করা অধিকাংশ শ্রমিকই নেপালের দূর পশ্চিমাঞ্চলের জুমলা জেলার বাসিন্দা। তারা দল বেধে এসব জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতে আসতেন। একসঙ্গে টানা কয়েক সপ্তাহ পরিবার থেকে দূরে কাটাতেন এবং গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। রোববার গভীর রাতে দলটি একটি বাসে গিয়ে ওঠে, যা তাদের রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাবে। এটি জুমলায় তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার যাত্রার প্রথম ধাপ, যা সড়কপথে যেতে কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে।

কম্পিত কণ্ঠে অমর বলেন, ’আমরা চাই মানুষ জানুক যে আমরা আমাদের বন্ধুদের ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এমনকি তাদের মৃতদেহগুলো হলেও।’

সূত্র: সিএনএন

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..