✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-৩০, | ১৪:৩৮:৪১ |কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে এখন যেন কেবল মৃত্যুর ছায়া আর স্বজনদের উৎকণ্ঠার শব্দ। করিডোরজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে একই প্রশ্ন— ‘তাকে কি এখনো শনাক্ত করা যায়নি?’, ‘লাশটাকে কীভাবে পচন থেকে রক্ষা করা যায়?’, ‘চার দিন হয়ে গেছে, তার বেঁচে থাকার আর কোনো সম্ভাবনা নেই?’
বাস্তবতা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার গল্প এখন আর প্রায় নেই। তবু সন্ধ্যার বৃষ্টির মধ্যে কাঠমান্ডুর টিচিং হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করছেন অসংখ্য পরিবার। শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে কেউ অপেক্ষা করছেন একটি সুখবরের জন্য। আবার কেউ ভাগ্যের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন সবচেয়ে খারাপ সংবাদটির জন্য।
তাদের চাওয়া এখন খুব সামান্য— প্রিয়জনের লাশটি যেন অন্তত খুঁজে পাওয়া যায়। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চান তারা।
অনেকেই অবশ্য ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন। বারবার নিজেদের গল্প বলতে বলতে তারা ক্লান্ত। ক্যামেরা হাতে সাংবাদিক দেখলেই অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার প্রতি সম্মান জানিয়ে দূরত্ব বজায় রাখছেন অনেকেই। কারণ তাদের অনেকেই নিজেরাও অল্পের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছেন।
এর মধ্যেই একদল বিদেশি সাংবাদিককে কান্নারত স্বজনদের ক্যামেরাবন্দি করতে দেখে এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন, ‘আপনাদের ক্যামেরা কি আমাদের মানুষদের ফিরিয়ে আনবে?’ পাশে থাকা স্বজনেরা তখন তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

হাসপাতালের গেটে দেবর ও এক ভাগ্নের ছবি টাঙাচ্ছিলেন দিল কুমারী মাছরঙ্গী মাগার। তার পাশে ঝুলছে আরও কয়েক ডজন মৃত মানুষের ছবি এবং নিখোঁজদের দীর্ঘ তালিকা।
তিনি অনুরোধ করেন, তার পরিবারের গল্পটি যেন সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। হয়তো পৃথিবীর কোথাও কেউ তাদের দেখেছেন।
শান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আশা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। যদি শুধু তাদের মৃতদেহও পাওয়া যায়, অন্তত আমরা জানতে পারব।’
কাছেই তার সঙ্গে কথায় যোগ দেন দীর্ঘ মায়া কুলমী মাগার। তার ভাগ্নেও নিখোঁজ। বন্যা আসার আগে সেদিন সকালে তিনি তাকে তিনবার ফোন করেছিলেন। কিন্তু কোনোবারই ফোন ধরেনি সে।
দুই নারীই মূলত উদয়পুরের বাসিন্দা। গত ২৬ আগস্ট সকালে তাদের স্বজনরা রাসুয়ায় কাজ করছিলেন। এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ।

ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর এখনো প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হচ্ছে। ত্রিশূলী নদী ও এর উপনদীগুলোতে কাদার স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষদের মধ্যে চীনের সীমান্ত এলাকাতেও প্রায় ৫০০ জন নিখোঁজ থাকার খবর রয়েছে।
তবে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেঁচে ফেরার দু-একটি বিরল ঘটনাও এখনো স্বজনদের আশার আলো দেখাচ্ছে।
গত শুক্রবার রাতে চীন সীমান্তের কাছে তিমুরেতে একটি বিধ্বস্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধারকারীরা ক্ষীণ একটি আর্তনাদ শুনতে পান। এরপর মরিয়া হয়ে কাদা সরিয়ে ছয় বছর বয়সী মনীষাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
নেপালি সেনাবাহিনী একটি সুড়ঙ্গ থেকে ৮০ জনেরও বেশি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মীকেও উদ্ধার করেছে। তবে ত্রিশূলী নদী ও এর উপনদীগুলোর তীরবর্তী ১২টি প্রকল্প থেকে আরও শত শত কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন।
বিশেষ সরঞ্জাম নিয়ে চীনা ও ভারতীয় উদ্ধারকারী দলও দুর্গম এলাকায় আটকে পড়াদের কাছে পৌঁছাতে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে।

প্রিয়জনদের খুঁজে পেতে কেউ কেউ এতটাই মরিয়া যে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার ভাড়া করার কথাও ভাবছেন। তবে সরকারি কর্মকর্তারা এ ধরনের উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করছেন। তাদের যুক্তি, সরকারি উদ্ধারকাজের অগ্রাধিকার পূরণে হেলিকপ্টারগুলো এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বজনদের খুঁজতে ধুনচে গিয়েছিলেন সুবাস তামাং। নিখোঁজরা সবাই ট্যুরিস্ট বাসের চালক ছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন সীমান্তে একদল পর্যটককে নামিয়ে দিয়ে ফেরার পথে ছিলেন।
সকাল ৮টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পরই কাদার দেয়াল ধসে পড়ে।
স্বজনদের সন্ধানে সুবাস চিতওয়ানেও গিয়েছেন— মৃতদেহগুলো সেখানে ভেসে গেছে কি না, তা দেখতে। এখন তিনি কাঠমান্ডুতে।
এক পুলিশ কর্মকর্তাকে তিনি বলতে শোনা যায়, ‘আমি বারবার স্বপ্ন দেখছি, তারা হয়তো কোনো একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে আছে এবং উদ্ধারের অপেক্ষায় আছে। যদি একটা হেলিকপ্টারে করে সেখানে যেতে পারতাম!’
পরে সাংবাদিকদের দিকে ফিরে হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আপনাদের মতো সাংবাদিকদের সাহায্যে আমরা আশা করি, শিগগিরই তাদের খুঁজে পাব।’

নেপাল সরকারের আনুষ্ঠানিক মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া লাশের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হচ্ছে। সংখ্যাটি ইতোমধ্যে ৭৩৪-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে নিখোঁজদের বড় সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে মৃতের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেক্ষেত্রে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এটি নেপালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
প্রিয়জনকে হারানোর বাস্তবতা ধীরে ধীরে মেনে নেওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন কেশরী তামাং। তিনি প্রতিদিন হাসপাতালে আসছেন।
গতকাল সন্ধ্যায় তাকে একটি মৃতদেহের ছবি খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করতে দেখা যায়। মৃতদেহটির একটি আঙুলে থাকা আংটিটি তার ভাই শঙ্খ বুদ্ধের পরা আংটির মতো।
বেত্রাবতীতে ভেসে যাওয়া সেতুগুলোর একটির পাশে তার ভাই একটি রেস্তোরাঁ চালাতেন। পুলিশ ডেস্কে তামাংকে আরও জানানো হয়, মৃতদেহটির উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং গায়ের রং ফর্সা।
তবে মৃতদেহটি কপিলবস্তু থেকে উদ্ধার হওয়ায় শনাক্তকরণ ও শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করতে তামাং ও তার পরিবার পিপরা হাসপাতালের মর্গে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এক আত্মীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘কাল সকালে রওনা দিলে প্রায় ১০ থেকে ১১ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাব। যদি ও না হয়, আমরা ফিরে আসব। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে, ও-ই।’
মৃতদের ছবিগুলো অস্বস্তিকর। জনসমক্ষে এমন বীভৎস ছবি প্রকাশের রীতিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিন্তু স্বজনদের কাছে আপাতত এসব ছবিই প্রিয়জনকে শনাক্ত করার শেষ সম্ভাব্য উপায়।

হাসপাতালের বাইরে এরপর দেখা মেলে একদল তরুণীর। সবার মুখেই একই রকম বিষণ্ণতা। তারা খুঁজছেন তাদের একমাত্র ভাই, ২৩ বছর বয়সী সন্তোষ থিং তামাংকে।
আট বোনের মধ্যে সবার বড় শান্তি মায়া তামাং জানান, উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলোর নতুন ছবি প্রকাশের অপেক্ষায় তারা হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
সন্তোষ নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি ক্যাফেতে বারিস্তা হিসেবে কাজ করতেন। ছুটিতে কাঠমান্ডু আসার পথে কেরুং এলাকায় এই দুর্যোগের কবলে পড়েন তিনি। নেপালের সময় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি রওনা হয়েছিলেন।
শান্তি মায়া বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে রক্ষা বন্ধন কাটানোর জন্য সে পাঁচ দিনের ছুটি নিয়েছিল। আমাদের বাবা-মা ফোন করে জানতে চান, আমরা আমাদের ভাইকে খুঁজে পেয়েছি কি না। আমরা সব জায়গায় খুঁজেছি। কিন্তু এখানকার কোনো তালিকায় তার ছবি বা নাম খুঁজে পাচ্ছি না। সে বিদুর ক্যাম্পেও নেই। আমরা টিকটকেও চেষ্টা করেছি।’
বোনেরা কাঠমান্ডুতে কাজ ও পড়াশোনা করেন। একটি ভাড়া করা ঘরেই তাদের বসবাস। তাদের বাবা-মা রাসুয়ার ভোতলেতে থাকেন। পাহাড়ের অনেক ওপরে হওয়ায় গ্রামটি তুলনামূলক নিরাপদ থাকলেও সেখানে যাওয়ার সড়কটি বন্যায় ভেসে গেছে। ফলে পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শান্তি মায়ার চোখে তখন আর কান্না নেই। যেন অশ্রুও শেষ হয়ে গেছে, নিঃশেষ হয়ে গেছে শেষ আশাটুকুও।
একঘেয়ে, ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার নিরাপদ। কিন্তু সব গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর কেউ বেঁচে নেই।’
কাঠমান্ডুর হাসপাতালের বাইরে তাই এখন অপেক্ষা শুধু একটি খবরের— জীবনের, অথবা মৃত্যুর। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার চেয়ে অনেক পরিবারের কাছে অন্তত একটি নিশ্চিত সংবাদই এখন স্বস্তির শেষ পথ।