✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-৩০, | ০০:৩৮:৪১ |ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসের শেষভাগে এসে গ্যাস সংরক্ষণের পরিমাণ ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় এই ‘শীতকালীন আতঙ্ক’ তৈরি হয়েছে। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের সংঘাত এবং রাশিয়ার জ্বালানির ওপর অব্যাহত নিষেধাজ্ঞার জেরে গ্যাস ব্যবসায়ীদের মধ্যে দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা ও তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ইউরোপীয় গ্যাস ট্রান্সমিশন সিস্টেম অপারেটরস নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আগস্টের শেষ নাগাদ ইইউর গ্যাস মজুত রয়েছে প্রায় ৬৪ শতাংশে। অথচ বিগত বছরগুলোতে এই মৌসুমে সাধারণত গড়ে ৮০ শতাংশ মজুত বজায় থাকত। ২০২১ সালের আগস্টের শেষ দিকেও এই হার ছিল প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং ২০১৩ সালে ছিল ৭২ শতাংশ। শীতকালে যখন গ্যাসের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়, তখন এই মজুত আরও আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়।
দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক। গ্যাস ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইউরোপের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, জার্মানির গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলোর ধারণক্ষমতা বর্তমানে মাত্র ৫০ শতাংশের কিছুটা ওপরে। এছাড়া নেদারল্যান্ডসের মজুত রয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং বেলজিয়ামের প্রায় ৫০ শতাংশে। নেদারল্যান্ডসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিশেষভাবে অভিযোগ করেছেন যে তারা শীতকালের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হতে পারেন। কারণ হিসেবে তারা ধীরগতির গ্যাস সরবরাহ এবং ব্যবসায়ীদের বর্তমানে গ্যাস কিনে তা শীতকালের জন্য সংরক্ষণ করার বাণিজ্যিক উৎসাহের অভাবকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলোর ধারণক্ষমতা মাত্র ৩০ শতাংশের ঘরে রয়েছে, যদিও দেশটি অতীতে মজুতের চেয়ে নিরবচ্ছিন্ন আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল।
এই সরবরাহ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা ৬৬ ইউরো বা ৭৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বছরের শুরুর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এসইবি-র প্রধান কমোডিটি বিশ্লেষক বিজর্ন শিলড্রপ দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক হবে—এই আশায় বাজার গ্রীষ্মকালে তুলনামূলক শান্ত ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ আর সহসা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন না। এর ফলে বিগত এক সপ্তাহ ধরে ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাস বাজারে এক প্রকার শীতকালীন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মজুতের এই দুর্বল অবস্থা ইউরোপীয় বাজারকে ঠান্ডা আবহাওয়া, কম বায়ু শক্তি উৎপাদন এবং অপ্রত্যাশিত সরবরাহ ব্যাঘাতের মুখে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। জ্বালানি বিশ্লেষক গ্রেগ মোলনার জানিয়েছেন যে এই কম মজুত স্তর শীতকালে দামের চরম অস্থিরতার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমান এই তীব্র চাপের তাৎক্ষণিক কারণ হলো হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া, যার ফলে কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। যদিও ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে কাতার ইইউর মোট এলএনজির মাত্র ৬.৬ শতাংশ সরবরাহ করেছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছিল ৫৭ শতাংশ; তবুও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইউরোপীয় ও এশীয় ক্রেতাদের মধ্যে জ্বালানি নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে, যা গ্যাসের দাম বাড়াতে বাধ্য করেছে।
এদিকে রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে এবং দেশটি থেকে জ্বালানি নির্ভরতা সম্পূর্ণ কাটিয়ে তোলার যে ঘোষণা ইইউ দিয়েছিল, বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে সেটিও। ২০২১ সালে ইউরোপের মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে, যা ২০২৫ সালের মধ্যে নেমে আসে মাত্র ১২ শতাংশে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ইউরোপ কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। সে সময় গ্যাসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা ৩০০ ইউরোর বেশি হয়ে গিয়েছিল।
সূত্র: আরটি