✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-২০, | ১৯:২৮:২১ |তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত আফ্রিকার দেশ সুদান। ভ্রাতৃঘাতী এই সংঘাতে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার ধারণা।
এতে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৫ লাখ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সুদানের ৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রায় ২ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ভেঙে পড়েছে অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রায় সব ধরনের জনজীবন।
সব মিলিয়ে সুদান ভয়াবহ মানবিক সংকটে জর্জরিত। দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি কলেরাসহ বিভিন্ন মহামারির প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
‘ড্রোন হামলা থেকে কোথাও লুকিয়ে থাকা যায় না।’—সুদানের অবরুদ্ধ শহর এল-ওবেইদের ২৭ বছর বয়সী বাসিন্দা এলসাদিগের কণ্ঠে ফুটে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের অসহায়তা। তার ভাষায়, ঘর থেকে বের হওয়া মানেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পথে নামা।
যুদ্ধের শুরুতে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল স্থলযুদ্ধ। কিন্তু এখন এল-ওবেইদের বাসিন্দাদের প্রধান আতঙ্ক আকাশ থেকে নেমে আসা ড্রোন হামলা।
গত জুনের শেষ দিকে একটি পানিবাহী ট্রাকের স্টেশনে অবস্থানকালে ড্রোন হামলার শিকার হন এলসাদিগ। এতে তার বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
একই হামলায় প্রাণ হারায় ৪২ বছর বয়সী পয়োনিষ্কাশন ট্রাকচালক আহমাদোর ৯ বছর বয়সী ছেলে। স্কুল শেষে বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসে সে নিহত হয়। এ ঘটনায় আহমাদোর আরও দুই সহকর্মীও প্রাণ হারান। পরে দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর আগুনে পুড়ে যাওয়া ট্রাকের ভেতর থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে তার পরিবার।
নিরাপত্তার কারণে সিএনএন তাদের শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করেছে।
এলসাদিগ বলেন, ‘আকাশে ড্রোনের শব্দ শুনলেই আমরা কংক্রিটের ভবনের নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কখন, কোথায় হামলা হবে—তা কেউ জানে না।’
ড্রোনে বদলে গেছে যুদ্ধের ধরন
২০২৩ সালের এপ্রিলে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালো (হেমেদতি)-এর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে সুদানের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘ একে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেছে।
যুদ্ধের শুরুতে সংঘাত মূলত স্থলভিত্তিক ছিল। কিন্তু এখন বিদেশি প্রযুক্তির উন্নত ড্রোন ব্যবহারের কারণে যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ড্রোন হামলায় অন্তত ৮৮০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যা ওই সময়ে মোট বেসামরিক মৃত্যুর ৮০ শতাংশেরও বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ডের প্রকাশনা আফ্রিকা ডিফেন্স ফোরাম জানিয়েছে, উভয় পক্ষই এখন স্থলবাহিনীর বদলে আকাশপথে হামলার ওপর বেশি নির্ভর করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কের সরবরাহ করা বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন সুদানের সেনাবাহিনীকে রাজধানী খার্তুম পুনর্দখলে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে আরএসএফও চীনে তৈরি দীর্ঘপাল্লার এফএইচ-৯৫ ড্রোন ব্যবহার করছে। এসবের কিছু সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরবরাহ করা বলে বিভিন্ন গবেষণা ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদিও আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নিরাপদ নয় বেসামরিক মানুষও
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এখন ড্রোন শুধু শত্রুপক্ষের অবস্থান নজরদারি বা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য নয়; বাজার, স্কুল, পানির স্থাপনা, জ্বালানি কেন্দ্র এবং জনবসতিতেও হামলা চালানো হচ্ছে।
উত্তর করদোফানের রাজধানী এল-ওবেইদ গত ১৮ মাস ধরে কার্যত অবরুদ্ধ। শহরটিতে অন্তত এক লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক জানিয়েছেন, শুধু জুন মাসেই শহর ও আশপাশে ১৫টি ড্রোন হামলায় অন্তত ৪৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এসব হামলায় ত্রাণ কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ৫০ টন ত্রাণ বহনকারী একটি ট্রাকও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।
‘বের হলে ফিরে আসব কি না, জানি না’
এল-ওবেইদের বাসিন্দারা বলছেন, সারাদিন আকাশে ড্রোনের গুঞ্জন শোনা যায়। মানুষ এখন এক জায়গায় জড়ো হতেও সাহস পাচ্ছে না।
বাস্তুচ্যুত নারী রিহ্যাব বলেন, ‘ড্রোন হামলা এত ঘন ঘন হচ্ছে যে মনে হয় যুদ্ধ যেন নতুন করে শুরু হয়েছে।’
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের সুদানবিষয়ক পরিচালক শাশওয়াত সারাফ বলেন, ‘পরিবারগুলো তাদের সন্তান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। যারা বেঁচে আছেন, তারা খাদ্যসংকটের মধ্যে আছেন, যাওয়ার মতো নিরাপদ জায়গাও নেই।’
তিনটি ড্রোন হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর চতুর্থ হামলায় একটি পা হারানো এলসাদিগ বলেন, ‘ঘর থেকে বের হলে জানি না আর ফিরতে পারব কি না। যে কোনো মুহূর্তে পাশেই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে পারে। বাঁচব নাকি মারা যাব—কেউ জানে না।’
সূত্র: সিএনএন