কূটনীতিকরা বলছেন, উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে আলোচনা এখনও চলছে। অন্যদিকে, মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে ইরানকে বাধ্য করার লক্ষ্যে তারা টানা দশম দফা হামলা চালিয়েছে।
সোমবার দিনের শুরুতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিমান হামলা সম্প্রসারণ করেছে এবং তেহরান ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর পর দেশটি এখন ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে’ রয়েছে। তবে কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, উত্তেজনা কমাতে আলোচনা এখনও চলমান।
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, তাবরিজে, যেখানে ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, এবং বুশেহরে, যেখানে ইরানের একমাত্র কার্যকর বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত, সেখানে হামলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা সামরিক কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ও উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, নৌ সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্কে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে ইরান বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটিতে এবং কুয়েতে হামলা চালায়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে চলাচলরত তেলবাহী জাহাজেও আঘাত হানে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে যেত।
বাহরাইন জানিয়েছে, হামলায় তাদের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়নি।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, আজ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।’
তিনি সতর্ক করেন, দেশটিকে আরও হামলা সহ্য করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার বলেন, সপ্তাহান্তে মার্কিন সেনারা নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য ইরানকে ‘বহুগুণ মূল্য দিতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জানায়, জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ থাকা আরেক সেনার মরদেহ শনাক্তের কাজ চলছে। এছাড়া ইরাকে একটি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করার সময় আরও একজন মার্কিন সেনা নিহত হয়।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট ১৭ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ সংঘাতে ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছে।
সর্বশেষ পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্য আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। যদিও গত মাসে হামলা বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, যা ৬০ দিনের বাস্তবায়ন সময়সীমার অর্ধেকের বেশি অতিক্রম করেছে।
সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার অতিক্রম করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
হুথিদের ঘোষিত সৌদি বন্দর অবরোধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ সৌদি আরব লোহিত সাগরপথ ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করছিল এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়েছিল।
হুথিরা দাবি করেছে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার গত সপ্তাহে সানা বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালানোর প্রতিক্রিয়ায় তারা এই অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং বলেছে, ‘অবরোধের জবাব অবরোধ দিয়েই দেওয়া হবে।’
তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে। রয়টার্সের বরাত দিয়ে জানা যায়, মধ্যস্থতাকারীরা ইরানকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করার উপায় খোঁজা যায়।
ইরান জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে, যদিও আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সোমবার ইসলামাবাদ সফরে যাওয়ার কথা ছিল বলে এএফপি জানিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনও আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে সেটি "বাস্তবসম্মত হতে হবে।"
তিনি বলেন, "আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়া চালিয়ে যাব। তবে যদি কূটনীতির সুযোগ তৈরি হয় এবং যারা ইরানের জন্য ইতিবাচক কিছু করতে চায় তারা আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে সেটি খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।"
কাতার ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে, যাতে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরা সম্ভব হয়।
সোমবার ভোরে হামলা শুরু হওয়ার সময় ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালীতে একটি জাহাজে আগুন লাগে। জাহাজের নাবিকরা নিরাপদে সেটি ত্যাগ করেন এবং পরে একটি টাগবোট জাহাজটিকে উদ্ধার করে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা দুটি তেলবাহী জাহাজ বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়েছে। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, তারা সিরিয়ার আল-তানফ অঞ্চলে একটি শত্রু কমান্ড সেন্টারে "আকস্মিক হামলা" চালিয়েছে।
রোববার ইরান জর্ডানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর পর ইসরায়েল সতর্ক করে বলেছে, যদি ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, তাহলে তারা "পূর্ণ শক্তি দিয়ে জবাব দেবে।"
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলে অতিরিক্ত কয়েক ডজন আকাশে জ্বালানি ভরার বিমান পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে, যাতে তেহরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে বাধ্য হয়।
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাসের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, "আমরা প্রথমে একটি বিরতি দিয়েছিলাম, যাতে ইরান তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত না করার বিষয়ে সমঝোতায় আসে। তারা তা করতে রাজি হয়নি। এখন আমাদের লক্ষ্য হলো, ইরানের সহযোগিতা থাকুক বা না থাকুক, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করা।"
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের তিনটি গ্রামে একটি পরীক্ষামূলক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। রোমে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে হওয়া আলোচনার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনারা সরে যাবে এবং তাদের জায়গায় লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে। তাদের দায়িত্ব হবে ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো অপসারণ করা।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র থমাস পিগট জানান, কর্মসূচিটি ফ্রাউন, শ্রিফা ও জাওতার আল-গারবিয়া গ্রামে শুরু হয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এ জাতীয় আরো খবর..