যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার কানাডা থেকে আমদানি হওয়া বিভিন্ন পণ্যের ওপর ৫০% শুল্ক (ট্যারিফ) আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের দাবি, কানাডা আমেরিকায় তৈরি গাড়ি, মদ এবং দুগ্ধজাত পণ্যের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। এই পদক্ষেপকে বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওয়াইন, সিমেন্ট, আইস হকি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর এই নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করতে ট্রাম্প ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্টের সেকশন ৩৩৮ ব্যবহার করেছেন। এই আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি মার্কিন পণ্যের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ৫০% পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারেন। প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে এই ধারাটি এবারই প্রথম ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে।
নতুন শুল্ক ৩০ দিনের মধ্যে কার্যকর হবে। এটি দুগ্ধজাত পণ্য, সুইমিং পুল, আসবাবপত্র, মাছ ধরার ছিপ, বীজ, পোশাক, উইগসহ আরও অনেক পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তর জানিয়েছে, এই শুল্ক কানাডা থেকে আমদানি হওয়া প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র কানাডা থেকে মোট ৩৮২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল। নতুন শুল্ক সেই মোট আমদানির প্রায় ৫.২% অংশকে প্রভাবিত করবে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রশাসন যখন আমাদের বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে ন্যায্য ও পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, তখন কানাডা অন্যান্য অংশীদার ও মিত্রদের মতো নয়; তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ভারসাম্য পুনঃস্থাপন এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট শিল্প রক্ষার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে।’
এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, তাঁর সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ মেটাতে বিস্তৃত প্রস্তাব দিয়েছে। তার দাবি, ট্রাম্পের আগের শুল্কগুলো উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (USMCA) লঙ্ঘন করেছে।
কার্নি বলেন, ‘এই বাণিজ্য বিরোধ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। আমাদের নাগরিকদের পারস্পরিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাকি সমস্যাগুলো সমাধানে কানাডা আন্তরিকভাবে আলোচনায় প্রস্তুত।’
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, কানাডা ও চীন ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের জবাবে পাল্টা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যে ইউএসএমসিএ বাণিজ্য চুক্তি সংশোধনের আলোচনায় মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি গ্রিয়ার কানাডাকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। তিনি এ সপ্তাহে মেক্সিকো সিটিতে মেক্সিকোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করছেন।
রোববার নিউ জার্সিতে ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের সময় ট্রাম্প ও কার্নির সাক্ষাৎ হয়। সেখানে ট্রাম্প কানাডার দাবানল নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি অভিযোগ করেন, দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর দূষণ মোকাবিলার ‘অপরিমেয় ব্যয়’ বিদ্যমান কানাডীয় পণ্যের শুল্কের সঙ্গে যোগ করা হতে পারে বলে গত সপ্তাহে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
সেকশন ৩৩৮-এর প্রথম ব্যবহার
১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্ট এবং এর সেকশন ৩৩৮ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক শুল্ক বৃদ্ধির জন্য পরিচিত। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদদের মতে, সেই সময় এসব শুল্ক এবং পাল্টা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দা আরও তীব্র করেছিল।
প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশের প্রশাসনে দায়িত্ব পালন এবং এই আইন নিয়ে ব্যাপক গবেষণাকারী যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা জন ভেরোনো বলেন, সেকশন ৩৩৮-এর উদ্দেশ্য ছিল এটা নিশ্চিত করা যাতে কোনো দেশ কিছু দেশের জন্য বিশেষ শুল্ক সুবিধা দিয়ে মার্কিন রপ্তানিকে বৈষম্যের শিকার না করে।
সূত্র: রয়টার্স
এ জাতীয় আরো খবর..