স্কুলের নিজস্ব খেলার মাঠ নেই, অনেকের স্কুল ড্রেস বানানোর সামর্থ্যও নেই। কখনও অনাহারে, কখনও অর্ধাহারে দিন কাটে। দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার ও নানা প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলা এসব খুদে শিক্ষার্থী এবার প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের বালিকা বিভাগে দেশসেরা হয়েছে। এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোরগাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা।
তাদের এই অসাধারণ সাফল্যকে স্বীকৃতি জানাতে সম্প্রতি সংবর্ধনার আয়োজন করে পাবনা জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থা। সেখানে খুদে ফুটবলার, তাদের শিক্ষক ও কোচের সঙ্গে কথা বলে উঠে আসে সংগ্রাম আর সাফল্যের অনুপ্রেরণামূলক গল্প।
সাঁথিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত বিদ্যালয়টির অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারই নিম্নআয়ের। কারও বাবা কৃষক, কেউ মাছ বিক্রি করেন, আবার কেউ দিনমজুর। অভাব-অনটনের মধ্যেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাই তাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে জাতীয় পর্যায়ের সাফল্যে।
দলের অধিনায়ক ফাতেমা আক্তারের ভাষ্য, ‘আমাদের স্কুলে খেলার মাঠ নেই। পাশের জোরগাছা কলেজ মাঠে অনুশীলন করি। এতে কিছু সমস্যা হলেও আমরা থেমে থাকিনি।’ কৃষক বাবার পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়ে সে জানায়, বাবা সব সময় তাকে উৎসাহ দেন। সে আরও ভালো খেলতে চায়।
দলের আরেক খেলোয়াড় চতুর্থ শ্রেণির লামিয়া আক্তারের বাবা মাছ বিক্রি করেন। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলেও খেলাধুলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা পায়নি বলে জানায় সে।
পঞ্চম শ্রেণির সুমাইয়া আক্তার, জান্নাতুল মাওয়া, লামিয়া আক্তার এবং চতুর্থ শ্রেণির মিতা খাতুন ও সালেহা সুলতানার বাবারাও কৃষক। দারিদ্র্যের মধ্যেই তাদের বেড়ে ওঠা। তবে ফুটবলের প্রতি প্রবল আগ্রহ নিয়ে তারা আরও ভালো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ভবিষ্যতে দেশের হয়ে খেলতে চায়।
দলের হয়ে এবার টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছে মারিয়া খাতুন। তার বাবাও একজন কৃষক। মারিয়া বলে, ‘খেলতে খুব ভালো লাগে। আমি ফুটবল খেলাটা চালিয়ে যেতে চাই। পাশাপাশি পড়াশোনাও করতে চাই। পরিবার সব সময় আমার পাশে আছে। তাই কোনো বাধাকেই বাধা মনে করি না।’
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের জেলা শাখার কোচ জহির ইকবাল বলেন, ‘ধনী পরিবারের মেয়েরা খুব একটা ফুটবলে আসে না। দেশের ফুটবলের ভিত্তি গড়ে দিচ্ছে মূলত দরিদ্র পরিবারের মেয়েরাই। তারা অনেক কষ্ট করে অনুশীলন করে। যথাযথ পরিচর্যা ও সুযোগ-সুবিধা পেলে তারা আরও অনেক দূর যেতে পারবে।’
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব মাসুদ রানা বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হলেও
আমরা তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় রাখতে চাই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় মানের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।’
জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘খুদে ফুটবলারদের এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। তাদের অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে এবং উৎসাহিত করতেই সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থেকে আরও বড় সাফল্য অর্জনে সহযোগিতা করা হবে।’
এ জাতীয় আরো খবর..