✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১০, | ১৫:০৩:২৪ |বিশ্বকাপে ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি পেনাল্টি মিসে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—পেনাল্টি নেওয়ার সময় বহুল ব্যবহৃত ‘স্টাটার-স্টেপ রান-আপ’ কি এখন আর আগের মতো কার্যকর?
ফক্সবরোর ম্যাচে তখনও কোনো দল গোলের দেখা পায়নি। সেই সময় মরক্কোর নুসাইর মাজরাউইয়ের ফাউলে পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। স্পটকিক নিতে গিয়ে স্বভাবসুলভ ‘স্টাটার-স্টেপ রান-আপ’ ব্যবহার করেন এমবাপ্পে। কিন্তু মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু তার দুর্বল শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন।
তবে সেই হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ম্যাচের ৬০ মিনিটে দুর্দান্ত বাঁকানো শটে মরক্কোর রক্ষণ ভেঙে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন এমবাপ্পে। ছয় মিনিট পর উসমান ডেম্বেলে দ্বিতীয় গোল করলে ২-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ফরাসিরা।
তবু ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এমবাপ্পের গোল নয়, বরং তার পেনাল্টি মিস।
ফুটবলে ‘স্টাটার-স্টেপ রান-আপ’ নতুন কিছু নয়। কিংবদন্তি পেলে, জন অলড্রিজ ও হুগো সানচেজও এই কৌশল ব্যবহার করেছেন। উদ্দেশ্য একটাই—শেষ মুহূর্তে গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করে ভুল দিকে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করা। ফিফার আইনও এই কৌশলকে বৈধতা দেয়, তবে শট নেওয়ার ঠিক আগে থেমে যাওয়া বা ফেইন্ট করা নিষিদ্ধ।
কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকেরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত। ভিডিও বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান ও তথ্যভান্ডারের কারণে তারা প্রতিপক্ষের পেনাল্টির ধরন আগেভাগেই জেনে রাখেন। ফলে একসময় কার্যকর থাকা এই কৌশল এখন অনেক ক্ষেত্রেই উল্টো ফল দিচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলছে। স্টাটার রান-আপে নেওয়া ২৬টি পেনাল্টির মধ্যে ১১টিই গোল হয়নি। সফলতার হার মাত্র ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে স্টাটার ছাড়া নেওয়া ৩৫টি পেনাল্টির মধ্যে ২৪টি জালে জড়িয়েছে, যেখানে সফলতার হার ৬৮ শতাংশ।
এমবাপ্পে ছাড়াও ব্রুনো গিমারায়েস, জোরগেন স্ট্রান্ড লারসেন, লিওনেল মেসির মতো তারকারাও এই বিশ্বকাপে স্টাটার রান-আপে পেনাল্টি মিস করেছেন। যদিও মার্কো আরনাউটোভিচ, নেইমার, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কাই হাভার্টজ ও ইয়োনে উইসার মতো কয়েকজন একই কৌশলে সফল হয়েছেন।
আইটিভিতে সাবেক ইংল্যান্ড ফরোয়ার্ড ইয়ান রাইট বলেন, "মনে হচ্ছে গোলরক্ষকেরা এখন স্টাটার রান-আপের রহস্য বুঝে ফেলেছে। এই কৌশলের বিপক্ষে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত।"
সাবেক স্কটল্যান্ড উইঙ্গার প্যাট নেভিনের মতে, এখন পেনাল্টি থেকে গোল করাই আগের চেয়ে কঠিন হয়ে গেছে।
তার ভাষায়, "গোলরক্ষকেরা এখন আরও লম্বা, দ্রুত ও অ্যাথলেটিক। তাদের কাছে প্রতিটি খেলোয়াড়ের পেনাল্টির বিস্তারিত তথ্যও থাকে। তাই সুবিধা পেতে খেলোয়াড়েরা নতুন কৌশল খোঁজেন। স্টাটার রান-আপও তারই একটি অংশ। কিন্তু গোলরক্ষকেরাও সেই কৌশলের জবাব খুঁজে ফেলছে।"
এমবাপ্পের ব্যর্থতার পেছনে আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দীর্ঘ অপেক্ষা। ভিএআর যাচাইয়ের কারণে পেনাল্টি দেওয়ার পর থেকে শট নেওয়া পর্যন্ত তিন মিনিটেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাকে।
ফরাসি সাংবাদিক জুলিয়েন লরেন্সের মতে, এই বিরতিই এমবাপ্পের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেয়।
তিনি বলেন, "রুটিন ভেঙে যাওয়ায় এমবাপ্পে দ্রুত শট নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেটি ছিল খুবই দুর্বল এবং বুনুর জন্য সহজ একটি সেভ।"
সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক রয় কিনও একই মত পোষণ করেন।
"তিন মিনিট অপেক্ষা একজন স্ট্রাইকারের জন্য অনেক বড় বিষয়। সময় যত বাড়ে, ততই আত্মবিশ্বাস কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সুবিধাটা গোলরক্ষকের দিকেই চলে যায়।"
তবে একটি পেনাল্টি মিসে এমবাপ্পের সামগ্রিক রেকর্ড ম্লান হয়ে যায়নি। ফ্রান্সের হয়ে এটি ছিল তার মাত্র দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। জাতীয় দলের জার্সিতে ১৬টি পেনাল্টির মধ্যে ১৪টিতেই গোল করেছেন তিনি। ক্লাব ফুটবলে ৬২টি পেনাল্টির মধ্যে সফল হয়েছেন ৫০ বার।
অন্যদিকে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা পেনাল্টি-স্টপার। বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ তার মুখোমুখি হওয়া ৯টি পেনাল্টির মধ্যে মাত্র দুটি গোল হয়েছে; চারটি তিনি ঠেকিয়েছেন এবং তিনটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি