✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১০, | ১৩:০০:১৭ |শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ আঘাত হানার আশঙ্কায় চীন, তাইওয়ান ও জাপানে জোরদার করা হয়েছে দুর্যোগ প্রস্তুতি। উপকূলীয় এলাকা থেকে মাছ ধরার নৌকা নিরাপদ বন্দরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, বন্যা প্রতিরোধে বালুর বস্তা সংগ্রহে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। একই সঙ্গে কৃষকেরা দ্রুত ফসল ঘরে তুলছেন। আবহাওয়াবিদদের মতে, গত কয়েক বছরের মধ্যে এটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়গুলোর একটি হতে পারে।
টাইফুন বাভি তাইওয়ানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় দক্ষিণ চীনে টাইফুন মায়সাকের ধ্বংসযজ্ঞের পর উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে আঘাত হানা মায়সাকে অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাইওয়ানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাছ ধরার শহর সুয়াওতে শত শত মাছ ধরার নৌকা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বন্দরে ভিড় করেছে। তিন মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি মাছ ধরার নৌকার অধিনায়ক চেন মিং-হুই বলেন, বাইরে এখন আবহাওয়া শান্ত মনে হলেও পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। তার ভাষায়, আকাশ পরিষ্কার দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আগের ঝড়ে বহু নৌকা ডুবে গিয়েছিল এবং পুরো শহর পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাভির প্রভাবে রাজধানী তাইপের উত্তরের পাহাড়ি এলাকায় এক মিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। সম্ভাব্য উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিতে প্রায় ২৯ হাজার সেনাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, ২০২৪ সালের কং-রে টাইফুনের পর এটিই তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড় হতে পারে। কং-রে টাইফুনে তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল।
চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছে, বাভির সর্বোচ্চ বাতাসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার। ঝড়টির বিস্তৃতি সবচেয়ে চওড়া অংশে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার, যা প্রায় ফ্রান্সের সমান। পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর তাইওয়ানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে শনিবার সন্ধ্যায় এটি চীনের পূর্বাঞ্চলের ফুজিয়ান প্রদেশে আঘাত হানতে পারে।
তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসনের পূর্বাভাসকারী জেসন চ্যাং বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত বড় আকারের টাইফুন দেখা যায়নি। তার মতে, ১৯৮৭ সালের পর আকারের দিক থেকে এটি তাইওয়ানে আঘাত হানা সবচেয়ে বড় ঝড় হতে যাচ্ছে। টাইফুনের আশঙ্কায় তাইওয়ানের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তাওইয়ান শনিবারের সব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বহির্গামী ফ্লাইট বাতিল করেছে।
বাভির প্রভাব জাপানেও পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে দেশটির আবহাওয়া সংস্থা। ওকিনাওয়ার বাসিন্দাদের শুক্রবার ও শনিবার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি, ভূমিধস, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছে।
জাপান এয়ারলাইনস শুক্রবারের ৫০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে, এতে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ যাত্রীর ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাহত হবে। অল নিপ্পন এয়ারওয়েজও ৩৪টি ফ্লাইট বাতিল করেছে, যার ফলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শনিবারও আরও কিছু ফ্লাইট বাতিল হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চীন, তাইওয়ান ও জাপানে শক্তিশালী টাইফুনের ঝুঁকি বাড়ছে। সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও ঘন ঘন টাইফুন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাণিজ্যিক আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠান আকুওয়েদারের বিশেষজ্ঞ জেসন নিকোলস বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে বাভির বাতাসের গতি কিছুটা কমতে পারে। তবে শুক্রবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তাইওয়ান ও পূর্ব চীনে এটি বিপজ্জনক অবস্থায় থাকবে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় গবেষক শিয়াংবো ফেং বলেন, দীর্ঘ সময় প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানির ওপর অবস্থান করায় বাভি বিপুল শক্তি ও আর্দ্রতা সঞ্চয় করেছে। ফলে স্থলভাগে আঘাত করলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ঝড়টির গতিপথে সামান্য পরিবর্তনও ক্ষতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
এদিকে দক্ষিণ চীনের অনেক এলাকা এখনো টাইফুন মায়সাকের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। মায়সাকের অবশিষ্ট অংশ থেকে চীনের মধ্যাঞ্চলের হুবেই প্রদেশে অন্তত দুটি স্থলভাগীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে সেখানে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গুয়াংসি অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে মানুষ নতুন ঝড় আঘাত হানার আগেই ঘরবাড়ি ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, অনেকে দ্বিতীয় তলার জানালা দিয়ে উদ্ধারকর্মীদের সহায়তায় নিচে নামছেন, আবার কেউ কোমরসমান পানিতে নেমে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধার করছেন। দুর্গম এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দিতে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।
বেইজিং নিউজের প্রকাশিত ছবিতে বিনইয়াং কাউন্টির একটি খামারে সারি সারি মৃত শূকর পড়ে থাকতে দেখা গেছে। টানা দুই দিন পানিতে ডুবে থাকায় প্রাণীগুলোর দেহ ফুলে পচতে শুরু করেছে। অন্যদিকে গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, গুয়াংসি অঞ্চলের গুইগাং চিড়িয়াখানায় বন্যার পানিতে তিনটি সিংহ মারা গেছে। এছাড়া জেব্রা, সজারু, টিয়া, র্যাকুনসহ প্রায় ১০০টি প্রাণী এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
তথ্য সূত্র- রয়টার্স।